Thursday, November 7, 2019

ছাড় পেয়েও কর জটিলতায় তৈরি পোশাক খাত

তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ। কিন্তু চলতি অর্থবছরের গত কয়েক মাস ধরে এই আয় নেতিবাচক বিবেচনায় সরকার পোশাক খাতের উৎস করসহ অন্য খাতে কিভাবে প্রণোদনা দেওয়া যায় এসব বিবেচনায় নিচ্ছে।

এ জন্য সরকার উৎস কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.২৫ শতাংশ করেছে। কিন্তু এটা কার্যকর অর্থবছরে প্রথম মাস থেকে নয়, এনবিআরের জারি করা এসআরও তারিখ থেকে। করছাড়ের এমন জটিলতায় বিজিএমইএ চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্রে জানা গেছে, তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রস্তুতকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ অক্টোবরের উৎস ০.২৫ শতাংশ চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই থেকে কার্যকর করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে উৎস কর জুলাই থেকে কার্যকর করার সুপারিশ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে এনবিআরকে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিবের লেখা সুপারিশপত্রে বলা হয়, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে ০.২৫ শতাংশ হারে কার্যকর করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য নির্দেশক্রমে সুপারিশ করা হলো।

এর আগে অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখ বিজিএমইএ বাণিজ্যসচিবকে ২১ অক্টোবর এনবিআর জারি করা এসআরও অনুসারে ১ শতাংশ উৎস কর থেকে ০.২৫ শতাংশ এসআরও জারির দিন থেকে কার্যকর করার কথা উল্লেখ করা হয়।

জানতে চাইলে রুবানা হক কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের শীর্ষ আয়ের রপ্তানি খাত পোশাক উদ্যোক্তা এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক স্বার্থ বিবেচনা নিয়ে উৎস কর চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস থেকে ০.২৫ শতাংশ হারে কার্যকর করার দাবি জানান।

পোশাক খাতের বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে তিনি নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ উৎস কর ও রপ্তানি বিলের ওপর স্ট্যাম ডিউটি প্রত্যাহার এবং ১ শতাংশ নগদ সহায়তা সব রপ্তানিকারকদের জন্য করা।

টানা তিন মাস ধরে আয় কমছে পোশাক রপ্তানির। অন্যদিকে প্রতিযোগী দেশগুলো এ সময় (২০১৯-২০) প্রবৃদ্ধি করছে। ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি। পাকিস্তান করেছে ৪.৭৪ শতাংশ আর ভারত করেছে ২.২৫ শতাংশ।

দেশগুলোতে গত সাত বছরে যে হারে ডলারের মান শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশে ততটা হয়নি। ফলে প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে বলে জানান রুবানা হক।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, দেশের রপ্তানি প্রক্রিয়ার অবকাঠামোতেও জটিলতা রয়েছে। দেশে রপ্তানি ডকুমেন্ট করতে সময় লাগে ১৪৭ ঘণ্টা। ভিয়েতনামের লাগে ৫০ ঘণ্টা। আমদানি প্রক্রিয়াতে আমাদের লাগে ১৪৪ ঘণ্টা আর ভিয়েতনামের লাগে ৭৬ ঘণ্টা।

বন্দর জটিলতার কথা উল্লেখ করে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, সেখানে আমাদের সময় লাগে ১৫৮ থেকে ১৬৮ ঘণ্টা। যেখানে ভিয়েতনামের লাগে ৫৫ ঘণ্টা। তাই দেশের প্রধান এই রপ্তানি খাতকে সংকট সময়ে রপ্তানি আয়ের ২৫ শতাংশের ডলারের ওপর পাঁচ টাকা করে বাড়তি প্রণোদনা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান করেছেন তিনি।

Tuesday, November 5, 2019

বারকি খানের ইসলাম গ্রহণ

আল্লামা ইবনে আসির (রহ.) মোঙ্গলীয় নেতা হালাকু খানের হাতে বাগদাদের পতনকে ‘ইসলামী সভ্যতার সূর্যাস্ত’ আখ্যা দিয়েছেন। ইসলামী খিলাফতের রাজধানী বাগদাদে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালান তিনি।

বারকি খান ছিলেন চেঙ্গিস খানের পৌত্র। অন্যান্য মোঙ্গল পরিবারের মতো শৈশবেই তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেন এবং অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। যুদ্ধের ময়দানে সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য জীবনে বহুবার পুরস্কৃত হন। তবে তাঁর ‘গোল্ডেন হর্ড’-এর শাসন (১২৫৭-৬৬ সাল) তাঁকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। ‘গোল্ডেন হর্ড’ ছিল তৎকালীন মোঙ্গল সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ, যা বর্তমানে তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয়।

বারকি খানের ইসলাম গ্রহণ

ধারণা করা হয়, বারকি খান ১২৫২ সালে বোখারায় ইসলাম গ্রহণ করেন।তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলা হয়, মরুযাত্রীদের একটি দল শহরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাদের আটক করে ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বারকি খান তখন ইসলামের একত্ববাদ ও অন্যান্য বিশ্বাসের ধারণা পান এবং মুগ্ধ হন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ধার্মিক জীবন যাপন করেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল আরো সুদূরপ্রসারী।

হালাকু খানের ধ্বংসযাত্রা

হালাকু খান ছিলেন চেঙ্গিস খানের অপর পৌত্র ও বারকি খানের চাচাতো ভাই। তিনি ছিলেন অর্ধস্বায়ত্তশাসিত মোগল অঞ্চল ইলখানেতের শাসক। হালাকু খান তাঁর অনিন্দ্য সুন্দরী খ্রিস্টান স্ত্রী ডোকজ খাতুন দ্বারা প্রচণ্ড রকম প্রভাবিত ছিলেন। হালাকু খানের পছন্দ-অপছন্দ ও রাজ্য পরিচালনায় তাঁর বিশেষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। হালাকু খান যখন নেস্টোরিয়ান চার্চ পরিদর্শনে যান তখন ‘অবিশ্বাসী মুসলিমদের’ বিরুদ্ধে খ্রিস্টান নেতারা তাঁকে খেপিয়ে তোলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন, যে ধ্বংসাত্মক অভিযান কয়েক বছর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ১২৫৬ সালে পারস্যের বিরুদ্ধে অভিযানের মধ্য দিয়ে হালাকু খানের মুসলিমবিরোধী অভিযান শুরু হয় এবং তা শেষ হয় ১২৫৮ সালে বাগদাদ পতনের মধ্য দিয়ে। বাগদাদ দখল করার পর আব্বাসীয় খলিফা আল মুস্তাসিম বিল্লাহ ও তাঁর সন্তানদের হত্যা করেন। দামেস্কের আইয়ুবি শাসকরাও হালাকু খানের নির্দয় আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। এ সময় একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তি এবং ‘আমার শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ মূলনীতির আলোকে ক্রুসেডার রাষ্ট্রসহ (খ্রিস্টান-মুসলিম যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী) অনেক খ্রিস্টান রাজ্য হালাকু খানকে সমর্থন জানায়।

মোঙ্গল ও মামলুক সংঘাত

পশ্চিম এশিয়ার বেশির ভাগ মুসলিম রাজ্য দখল করার পর হালাকু খান মামলুক সুলতানদের দিকে মনোযোগ দেন। তাঁকে সমর্থন জানায় সামন্তরাজ্য জর্জিয়া ও সিসিলিয়ান আর্মেনিয়া। তিনি নিম্নের চিঠিসহ মামলুক সুলতানের কাছে একজন দূত প্রেরণ করেন। চিঠিতে তিনি রাষ্ট্র দখল ও গণহত্যার হুমকি দেন।

হালাকু খানের চিঠির ভাষা সুলতান কুতুজকে (মালিক মুজাফফর সাইফুদ্দিন কুতুজ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করে। তিনি মোঙ্গল রাষ্টদূতকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাঁর উত্তর দেন, যদিও এটি ইসলামী রীতি নয়।

এটি সহজেই অনুমেয় মামলুকদের শক্তি মোঙ্গল ও তাদের মিত্রদের তুলনায় যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। চীনে ‘দ্য গ্রেট খান’ (মোঙ্গলীয় গোত্রগুলো ও সাম্রাজ্যের প্রধান) মারা যান। ফলে হালাকু খান ঘরে ফিরতে বাধ্য হন। এ ছাড়া আর্থিক সংকটের কারণে সেই বিশাল বাহিনী ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। তাঁর শত্রুদের জন্য এটি ছিল এক অপূর্ব সুযোগ, যা কাজে লাগাতে এগিয়ে আসেন মামলুক সুলতান কুতুজ ও তাঁর মিসরীয় সেনাপতি রোকনুদ্দিন বাইবার্স। তাঁদের সম্মিলিত আক্রমণে ১২৬০ সালে আইনে জালুতের যুদ্ধে হালাকু খান ও তাঁর মিত্ররা (জর্জিয়া ও আর্মেনিয়া) পরাজিত হয়। এটি মোঙ্গল বাহিনীর প্রথম পরাজয়, যাকে বলা হয় ইতিহাসের বাঁকবদলকারী যুদ্ধ।

বারকি খান ও হালাকু খানের যুদ্ধ

আইনে জালুত যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতে ১২৬২ সালে হালাকু খান মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে আবার অভিযানের ঘোষণা করেন। প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে হালাকু খান মামলুকদের তুলনায় অনেক বড় বাহিনী গড়ে তোলেন; যদিও হালাকু খানের বাহিনীই মামলুকদের শায়েস্তা করতে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এবার তাঁকে প্রতিহত করার উদ্যোগ নেন বারকি খান। মোঙ্গল নেতা ‘গ্রেট খান’-এর উদ্দেশে এক চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘হালাকু খান মুসলিম শহরগুলো দখল করেছেন এবং খলিফাকে হত্যা করেছেন। আল্লাহর সাহায্যে আমি তাঁকে নিরপরাধ মানুষের রক্তের জবাবদিহি করতে ডাকব। হালাকু খান যেন আর কোনো মুসলিম অঞ্চলে আগ্রাসন না চালান। ’

বারকি-হালাকু যুদ্ধ ১২৬২ ছিল পশ্চিমাঞ্চলীয় মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রথম গৃহযুদ্ধ। ককেশাস পাহাড়ের পাদদেশে দুই বাহিনীর যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত জয় বা পরাজয়বরণ করেনি। তবে এর মাধ্যমে হালাকু খানের ক্ষমতার অবসান হয়। তেরেক নদীর তীরে বারকি খানের ভ্রাতুষ্পুত্র নোগাইয়ের সঙ্গে হালাকু খানের শেষ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধের পর তিনি ফিরে যেতে বাধ্য হন। ১২৬৫ সালে হালাকু খানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মুসলমানের বিরুদ্ধে তাঁর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটে।

বারকি খানও এই সংঘাতের অবসান চাচ্ছিলেন। চাচাতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তিনিও দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আজ মোঙ্গলদের তলোয়ারে মোঙ্গলরা কাটা পড়ছে। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই, তাহলে আমরা পৃথিবী শাসন করতে পারব। ’ হ্যাঁ, বারকি খান বসে বসে কোটি কোটি মুসলিম হত্যার দৃশ্য দেখতে চাননি। মানবিক প্রয়োজনে তিনি হালাকু খানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ান এবং তাতে তিনি সফলও হন।

বারকি খানের সাফল্য

হালাকু খানের মৃত্যুর আনুমানিক এক বছর পর ১২৬৬-৬৭ সালে বারকি খান ইন্তেকাল করেন। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে তাঁর বড় ভ্রাতুষ্পুত্র তৈমুরের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তিনি বারকি খানের নীতি অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করেন। ইলখানাতের বিপরীতে মামলুকসহ মুসলিম শাসকদের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তোলেন।

বারকি খান তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনামলে যে কাজ করেন তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। বিশেষত হালাকু খানের ধ্বংসযাত্রা থামিয়ে তাঁর হাত থেকে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম গোত্রগুলোকে রক্ষা করেন; যদিও বেশির ভাগ ঐতিহাসিক আইনে জালুতের যুদ্ধকেই ইতিহাসের বাঁকবদলকারী আখ্যা দেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা ছিল একটি প্রাথমিক জয়। এর পরও মুসলিমবিশ্ব হালাকু খানের আক্রমণঝুঁকিতে ছিল। তা ছাড়া হালাকু খান নিজেও সেই যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন না। তবে অসম যুদ্ধে মামলুকদের বিজয় অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। এই কৃতিত্বের প্রকৃত দাবিদার বারকি খান। তাঁর বাহিনীই হালাকু খানকে ডেরায় ফিরে যেতে বাধ্য করেছিল। তিনি আরেকটি মুসলিম গণহত্যা রোধ করতে সক্ষম হন। তিনি যদি হালাকু খানকে রোধ না করতেন হয়তো ইসলামের পবিত্র ভূমিও বাগদাদের মতো রক্তে ভেসে যেত। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বর্তমান সময়ের মুসলিম ঐতিহাসিকরা বারকি খানের এই অবদান স্মরণ করেন না।

যদিও বারকি খান কোনো দরবেশ ছিলেন না, তবে তিনি মুসলিম ভ্রাতৃত্ব লালন করতেন। সংকটপূর্ণ সময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বর্তমান সময়ের নেতাদের মতো মিথ্যা জাতীয়তাবাদ, সীমানা, রাজনীতির কূটকৌশল ও ব্যক্তিস্বার্থ বারকি খানকে ‘উম্মাহ চিন্তা’ থেকে দূরে ঠেলে দেয়নি। এটিই বারকি খানের শ্রেষ্ঠত্ব। আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দিন। আমিন।

 

তথ্যসূত্র : জ্যাকসন পিটার, দ্য মোঙ্গল অ্যান্ড দ্য ওয়েস্ট : ১২২১-১৪১০; এস ব্লেয়ার, এ কম্পেনডিয়াম অব ক্রোনিকালস : রাশিদ আল-দিনস ইলাস্ট্রেটেড হিস্টরি অব দ্য মুসলিম; জোহান এলভারস্কোগ, বুড্ডিজম অ্যান্ড ইসলাম অন দ্য সিল্ক রোড

 


Monday, November 4, 2019

বছরের নষ্ট হওয়া খাবার দিয়ে ২০০ কোটি লোককে খাওয়ানো সম্ভব

আপনি কি জানেন বিশ্বে প্রতিবছর কত খাবার নষ্ট হয়? এর পরিমাণ প্রায় ১৪০ কোটি টন। এই হিসাব জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বা এফএওর। সংস্থাটি বলছে, এই নষ্ট হওয়া খাবার বিশ্বে মোট খাদ্য জোগানের এক-তৃতীয়াংশ, যা দিয়ে প্রতিবছর ২০০ কোটি মানুষকে পেট ভরে খাওয়ানো সম্ভব।

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবছর নানাভাবে খাদ্য নষ্ট হয়। বলা হচ্ছে, খাদ্য নষ্টের পরিমাণ কমিয়ে আনা গেলে অপুষ্টিতে ভোগা জনসংখ্যার পরিমাণ ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্য, তা বাস্তবায়ন সহজ হবে।

ধনী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী ওই বছর ১৩ হাজার ৩০০ কোটি পাউন্ড খাদ্য নষ্ট হয়, যা জনপ্রতি বছরে ৪২৯ পাউন্ড এবং দেশটির মোট খাদ্য সরবরাহের ৩১ শতাংশ। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৬ হাজার ২০০ কোটি ডলার (১৩ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা) মূল্যের খাবার নষ্ট হয়।

আর আমাদের দেশে মাঠ থেকে থালা পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রতিটি স্তরেই খাদ্য নষ্ট হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো নাজনিন আহমেদ বরিশালের দুটি ওয়ার্ডে একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। ২০১৬ সালের নভেম্বরে উপস্থাপিত গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ফসল কাটার পরের পর্যায়ে উৎপাদনের মোট ১০ শতাংশ নষ্ট হয়। ২০১৮ সালে মোট উৎপাদিত ধানের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টন। গবেষণার ফল অনুযায়ী, প্রায় ৩৬ লাখ টন ধান নষ্ট হয়েছে।

খাদ্য নষ্টের এই পরিমাণই বলে দিচ্ছে, বেশি বেশি খাদ্য উৎপাদন করে মানুষকে ক্ষুধামুক্ত করার ধারণা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। যা উৎপাদিত হচ্ছে, তার যথাযথ ব্যবহার করার দিকটি অবহেলা করলে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

বিশ্ব পরিস্থিতি

জাতিসংঘের পরিবেশসংক্রান্ত ওয়েবসাইট (unenvironment.org) জানাচ্ছে, শিল্পোন্নত দেশগুলোতে বছরে খাদ্য নষ্টের আর্থিক মূল্য ৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। আর উন্নয়নশীল দেশে এর পরিমাণ ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার। ধনী দেশগুলোতে ভোক্তারা বছরে ২২ কোটি ২০ লাখ টন খাবার নষ্ট করেন, যা সাবসাহারা দেশগুলোর মোট খাদ্য উৎপাদনের (২৩ কোটি টন) সমান। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বছরে মাথাপিছু খাবার নষ্ট করার পরিমাণ প্রায় ১১৫ কেজি। সাবসাহারা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মাথাপিছু খাবার নষ্ট করা হয় বছরে ৬-১১ কেজি।

এই ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, যে পরিমাণ খাবার দুনিয়াজুড়ে বর্তমানে নষ্ট করা হয়, তার এক-চতুর্থাংশও যদি বাঁচানো যায়, তাহলে তা দিয়ে ৮৭ কোটি ক্ষুধার্ত মানুষকে খাওয়ানো যাবে। গত ১৫ জুন লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকা জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮২ কোটি। আর এ বছরের ৩ এপ্রিল লন্ডনভিত্তিক চিকিৎসাবিষয়ক জার্নাল ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, যথেষ্ট পুষ্টিকর খাবার না খাওয়ার কারণে ২০১৭ সালে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা ওই বছরের মোট বয়স্ক লোকের মৃত্যুর ২২ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধাশূন্য পৃথিবীর যে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তা আসলে খুব বাস্তব বলে মনে হচ্ছে না।

ছবিটি প্রতীকী । ছবি: প্রথম আলোছবিটি প্রতীকী । ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশ পরিস্থিতি

এখন দেখা যাক, আমাদের চিত্রটা আসলে কেমন? গ্রামাঞ্চলে চাষাবাদ ও উৎপাদনের পর্যায়ে খাদ্যপণ্য নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু শহরে? বাংলাদেশের ওয়েস্ট ডেটাবেইস ২০১৪ অনুসারে শহরগুলোর কঠিন আবর্জনার প্রায় ৬৮ শতাংশ হচ্ছে খাবার আর সবজি। ১৯৯১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত নগরে মাথাপিছু বর্জ্য উৎপাদন শূন্য দশমিক ৩১ থেকে বেড়ে হয়েছে শূন্য দশমিক ৪১। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই হার বেড়ে দাঁড়াবে শূন্য দশমিক ৬১ পর্যন্ত। বর্জ্য তৈরির এই হার বাড়াই খাদ্য নষ্ট হওয়ার হার বাড়ারও ইঙ্গিত দেয়।

ওয়েস্ট ডেটাবেইসের তথ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশে যে পরিমাণ খাদ্য কেনা হয়, তার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নষ্ট হয়। এর ৩ শতাংশ নষ্ট হয় খাদ্যদ্রব্য কেনা এবং খাবার প্রস্তুত করার সময়। এ তথ্য বরিশালের।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর কত পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয়, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য তাঁর কাছে নেই। তবে এটা তো ঠিক, সব জায়গাতেই খাবার নষ্ট হচ্ছে। শহরে বিশেষ করে বড় শহরে এটা বেশি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘খাবার নষ্ট না করে তা অভুক্ত বা দরিদ্র মানুষকে দেওয়ার আহ্বান আমি সব সময়ই জানাই। এ ব্যাপারে সরকারের যদি আরও কিছু করার থাকে, তাহলে সেটা করা হবে।’

আমাদের দেশে খাবার নষ্ট হয় মূলত দুই ভাবে—এক. চাষ, ফসল সংগ্রহ, সংরক্ষণ আর সরবরাহের সময়ে। আর ভোক্তার কাছে খাবার বিক্রি, রান্না ও খাবার সময়ে। অন্যদিক কৃষকেরা সঠিক পূর্বাভাস না পেলে একই ফসল বেশি চাষ করেন। ফলে জোগান অতিরিক্ত হয়ে উৎপাদন নষ্ট হয়। দেশে নগরায়ণ বাড়ার ফলে খাদ্য উৎপাদনের জায়গা থেকে ভোক্তার দূরত্ব বাড়ছে। পরিবহনের সময়ে বেশি লাগায় খাদ্য নষ্ট হচ্ছে।

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বা এফএও জানাচ্ছে, বাংলাদেশে অপুষ্টির পরিস্থিতি ২০১৫ সালের ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০১৬ সালে কমে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ হয়। কিন্তু ২০১৭ সালে তা আবার সামান্য বেড়ে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ হয়। কিন্তু এই হার ৫ শতাংশ নামিয়ে আনাই লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জন করতে গেলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে দ্রুত। ২০১৮ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স অনুযায়ী ১১৯ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৮৬তম অবস্থানে আছে। এ রকম পরিস্থিতিতে মোট খাদ্য উৎপাদনের ১০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়া কমিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শহরাঞ্চলে মানুষের খাদ্য গ্রহণের ধরন নিয়ে জ্যাঁ পিয়ের পোলে তাঁর ‘দ্য সোসিওলজি অব ফুড’ বইয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, শহরে পরিবারগুলোতে আশপাশের মানুষের পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে আরও কম। জীবনযাত্রার বৈশিষ্ট্যের কারণে তাঁদের খাবার গ্রহণের নির্দিষ্ট কিছু ধরন থাকে। প্রতি বেলা বাজার বা খাবার রান্নার বদলে রান্না করে রাখা খাবার খাওয়ার প্রবণতা থাকে। এর ফলে খাবার নষ্ট হয় বেশি। সেই সঙ্গে থাকে বাইরে খাওয়ার অভ্যাস এবং সুপার শপ থেকে খাদ্যদ্রব্য কেনার স্বভাব। ফলে বড় শহরে খাবার নষ্টও হয় অনেক বেশি।

খাবার নষ্ট হওয়ার একটি মৌসুমি ধরনও আছে। শীতকালে পরিবেশ অনুকূল থাকায় বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান বেশি হয়। অবশ্য সারা বছর এসব অনুষ্ঠান কমবেশি চলে। আর এসব গণ-অনুষ্ঠানে খাবার নষ্টের পরিমাণ বেশি হয়, যা আদপে ফেলে দেওয়া হয়। দেশজুড়ে এই অপরিকল্পিত আয়োজন খাবার নষ্টে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে।

এই সংস্কৃতি পরিবেশে সরাসরি ও তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুসারে ফেলে দেওয়া খাবার থেকে বছরে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে মিশছে।

ছবিটি প্রতীকী । ছবি: প্রথম আলোছবিটি প্রতীকী । ছবি: প্রথম আলো
মোকাবিলায় বিশ্ব যা করছে

বিশ্বে খাদ্য উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে খাবার নষ্টের পরিমাণও বাড়ছে। তবে এসব তথ্য এখন আর শুধু পরিসংখ্যান পর্যায়ে থেমে নেই। বিশ্বনেতারা বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন। গত ১২ জুন পূর্ব ইউরোপের দেশ মলদোভায় বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ইউরোপ আর মধ্য এশিয়ার আঞ্চলিক দপ্তর এ বিষয়ে বিশেষ আলোচনার আয়োজন করে। ওই আলোচনায় দেশগুলো খাদ্য নষ্ট করা রোধ করতে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে সম্মত হয়েছে। এর আগে এ বছরের ১৭ মে ইউরোপীয় ফুড ব্যাংক ফেডারেশন খাদ্য নষ্ট রোধে যথাযথ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে আন্তর্জাতিক সভার আয়োজন করেছিল।

অনেক দেশই খাবার নষ্ট প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ইতালি খাবার নষ্ট রোধ করতে আইন করেছে। বিক্রি না হওয়া খাবার ব্যবসায়ীরা ফেলে না দিয়ে দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দান করবেন। হিসাব করা দেখা গেছে, এ কাজ করলে তার পরিবেশ, অর্থনৈতিক আর নৈতিক লাভ অনেক বেশি। ফ্রান্স একই রকম আইন পাস করেছে ২০১৭ সালে। সেখানে খাবার নষ্ট করলে জরিমানার বিধান হয়েছে। ইতালি নিয়েছিল ভিন্ন পন্থা। যেসব প্রতিষ্ঠান খাবার নষ্ট না করে দান করবে, তাদের জন্য করে বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাবার নষ্ট রোধ করার জন্য বিল আনার প্রস্তুতি চলছে।

ফ্রান্সের মতো ধনী দেশের বিষয়টি একটু গভীরভাবে দেখা যাক। দেশে বেকারত্ব আর গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ায় অনেক পরিবার খাবারের সংকটে ভুগছে। মুদি দোকানগুলোর ফেলে দেওয়া খাবার নেওয়ার জন্য দরিদ্র মানুষেরা দোকানের জিনিসপত্র ফেলার জায়গায় ভিড় করছেন। অনেক দোকানের কর্মীরা ফেলে দেওয়া খাবারের ওপর ব্লিচিং পাউডার ঢেলে দিচ্ছিলেন। কেউবা সেখানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছেন, যাতে গরিব লোকেরা ফেলে দেওয়া ভালো খাবারগুলো নিতে না পারেন। এসব সামলানোর জন্য ফরাসি সরকার এমন আইন করে, যাতে এই নিষ্ঠুর আচরণ প্রতিহত করা যায়। আইনে বলা হয়, সুপার মার্কেটগুলো যদি এখন খাবার নষ্ট করে, বেঁচে যাওয়া খাবার গরিব মানুষকে দেওয়ার ব্যবস্থা না করে, তাহলে জরিমানা, এমনকি জেল পর্যন্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ কী করছে

বাংলাদেশেও নগর অঞ্চলে খাবার নষ্ট করার বদলে তা অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কিছু প্রয়াস শুরু হয়েছে। এই সমস্যাটিকে সম্যকভাবে মোকাবিলার জন্য যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে উৎপাদন আর তৈরি খাবার নষ্টের সর্বোপরি ধারণা পাওয়ার জন্য যথাযথ গবেষণা ও সেই অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পদক্ষেপ।

খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আইন করে খাদ্য নষ্ট বন্ধ করার চেষ্টা কতটা সফল হবে, তা বলতে পারি না। তবে প্রথমে মানুষকে সচেতন করে হবে। মানবিক দিকটা বোঝাতে হবে। অভুক্ত মানুষ যে এই খাবার খেয়ে জীবন ধারণ করতে পারে, সেটা সবার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি প্রত্যেক মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।

Friday, November 1, 2019

হোয়াটস্ অ্যাপ : যেভাবে বুঝবেন গোয়েন্দারা আড়ি পেতেছে

এপ্রিল মাসে ফস্টিন রুকান্ডোর হোয়াটস্ অ্যাপে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে রহস্যজনক কল আসে। তিনি কলটি রিসিভ করলেও অপর প্রান্ত থেকে কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। মি: রুকান্ডো সে নম্বরটিতে কল করলেও কেউ রিসিভ করছিল না। রুয়ান্ডার অধিবাসী মি: রুকান্ডো ব্রিটেনের লিডসে বসবাস করেন। নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সম্পর্কে তিনি ছিলেন সচেতন।

যে নম্বর থেকে তার কাছে কল এসেছিল সে নম্বরটিকে তিনি অনলাইনে সার্চ করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি খুঁজে পান যে নম্বরটির কোড সুইডেনের। বিষয়টি তাঁর কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছে। কিন্তু দ্রুত সেটি ভুলে যান রুকান্ডো। এরপর আরো কিছু অপরিচিত নম্বর থেকে তার কাছে কল আসতে থাকে। ফলে নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন রুকান্ডো।

ফলে নতুন আরেকটি ফোন ক্রয় করেন তিনি। কিন্তু সেটি ক্রয়ের একদিনের মধ্যে তার কাছে আবারো সেই অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে।

মি: রুকান্ডো বলেন,‘আমি যখনই সে নম্বরটিতে ফোন করি, তখন কেউ সাড়া দেয়না।তখন আমি বুঝতে পারলাম যে কোন একটা সমস্যা আছে। কারণ, আমার মোবাইল থেকে ফাইল হারিয়ে যাচ্ছিল।’

মে মাসে তিনি সংবাদপত্রে একটি খবর দেখতে পান যে হোয়াটস্ অ্যাপ হ্যাক করা হয়েছে। তখন তিনি বুঝতে পারেন তার ক্ষেত্রে কী ঘটেছে।

‘আমি আমার ফোন সেটটি পরিবর্তন করি এবং নিজের ভুল বুঝতে পারি। তারা আমার নম্বরটিকে অনুসরণ করছিল এবং ফোন কল করার মাধ্যমে প্রতিটি নতুন সেটে গোয়েন্দা সফটওয়্যার ঢুকিয়ে দিচ্ছিল।’

মি: রুকান্ডো বুঝতে পারেন যে হোয়াটস্ অ্যাপে-এর ত্রুটিকে ব্যবহার করে হ্যাকাররা প্রায় ১৪০০ ব্যক্তিকে টার্গেট করেছে। তিনি এবং তার সহকর্মীরা এর মধ্যে রয়েছেন। চলতি সপ্তাহে এ বিষয়টি আরো নিশ্চিত হওয়া যায় যখন তিনি কানাডার টরন্টো থেকে সিটিজেন ল্যাব-এর ফোন পান।

এই প্রতিষ্ঠানটি গত ছয়মাস যাবৎ ফেসবুকের সাথে একত্রিত হয়ে কাজ করছে হোয়াটস্ অ্যাপ হ্যাকিং-এর বিষয়টি তদন্ত করার জন্য। এর মাধ্যমে তারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে।

গবেষকরা বলেন,‘এই ঘটনায় তদন্তের অংশ হিসেবে সিটিজেন ল্যাব ১০০টির বেশি ঘটনা চিহ্নিত করেছে যেখানে ২০টি দেশের মানবাধিকার কর্মী এবং সাংবাদিকদের টার্গেট করা হয়েছে।’

মি: রুকান্ডো রুয়ান্ডার শাসক গোষ্ঠীর কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত। স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে যে ধরণের ব্যক্তিদের টার্গেট করা হয়েছে মি: রুকান্ডো তাদের মতোই। হোয়াটস্ অ্যাপ হ্যাক করার এই সফটওয়্যার তৈরি করেছে ইসরায়েল-ভিত্তিক এনএসও গ্রুপ। তারা বিশ্বের ২০টি দেশের সরকারের কাছে এটি বিক্রিও করেছে।

সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং কূটনীতিকদের উপর নজরদারীর জন্য হ্যাকাররা এই সফটওয়্যার ব্যবহার করে।

মি: রুকান্ডো বলেন, প্রথমবার হ্যাক হবার পর থেকে তার কাছে আর কোন ফোন আসেনি। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা তাকে এবং তার পরিবারকে আতংকিত করেছে।

‘সত্যি বলতে এই সংস্থাটি হ্যাকিং-এর বিষয়টি নিশ্চিত করার আগেই আমরা আতংকিত হয়েছিলাম। মনে হচ্ছে দুই সপ্তাহ ধরে তারা আমার ফোনে আড়ি পেতেছে এবং আমার সবকিছুতে তারা দেখেছে, " বিবিসিকে বলছিলেন তিনি। সে সময়ের মধ্যে শুধু আমার কর্মকাণ্ড নয়, আমার পুরো ই-মেইল ইতিহাস এবং আমার সব ফোন নম্বর তারা দেখেছে। সবকিছুই তারা দেখেছে - কম্পিউটার, ফোন কোন কিছুই নিরাপদ নয়। আমরা যখন কথা বলি তখনও তারা সবকিছু শুনতে পায়। আমি এখনো নিরাপদ বোধ করি না।’

মি: রুকান্ডো ২০০৫ সালে রুয়ান্ডা ছেড়ে আসেন যখন সরকারের সমালোচকদের আটক করে জেলে ঢোকানো হচ্ছিল।

ইসরাইলের এনএসও গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার চেষ্টা করছে হোয়াটস্ অ্যাপে-এর মালিক ফেসবুক। কিন্তু এনএসও গ্রুপ বলছে তারা কোন অন্যায় করেনি। আদালতে দাখিল করা কাগজপত্রে ফেসবুক অভিযোগ করেছে হোয়াটস্ অ্যাপ-এর অজানা ত্রুটিকে কাজে লাগিয়েছে এনএসও গ্রুপ।

পৃথিবীর ১৮০টি দেশের ১.৫ বিলিয়ন মানুষ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে। এই অ্যাপটি জনপ্রিয় হবার মূল কারণ ছিল ব্যবহারকারীদের তথ্যের গোপনীয়তার জন্য। একজনের কাছ থেকে যখন অপরজনের কাছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বার্তা যায়, তখন সেটিকে বাধাগ্রস্ত করলেও পড়া সম্ভব হয় না। প্যাগাসাস নামের এই শক্তিশালী সফটওয়্যারটি তৈরি করেছে এনএসও গ্রুপ। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে মোবাইল ফোন থেকে দূর হতে গোপনে তথ্য হাতিয়ে নেয়া যায়।

এর মাধ্যমে হ্যাকাররা ফোন সেটের সকল কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে। এর আগের ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে, একটি ওয়েব লিংকের মাধ্যমে গোয়েন্দা সফটওয়্যারটি ডাউনলোড করার ফাঁদ পাতা হয়েছিল। কিন্তু ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলছে ব্যবহারকারীদের ফোনসেটে তাদের অজ্ঞাতে এই সফটওয়্যারটি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত এনএসও গ্রুপ বিভিন্ন দেশে রেজিস্ট্রিকৃত ফোন নম্বর ব্যবহার করে হোয়াটস্ অ্যাপ অ্যাকাউন্ট খুলেছে। যেসব দেশের ফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে সাইপ্রাস, ইসরায়েল, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, সুইডেন এবং নেদারল্যান্ডস।

এরপর এপ্রিল এবং মে মাসে সে গ্রুপটি তাদের টার্গেট করা ব্যক্তিদের হোয়াটস্ অ্যাপ-এ ফোন করার মাধ্যমে সেগুলোকে হ্যাক করে।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ আদালতে যে অভিযোগ দাখিল করেছে সেখানে বলা হয়েছে, হোয়াটস্ অ্যাপ-এর ভেতরে থাকা কারিগরি বিষয়গুলো এড়িয়ে যাবার জন্য এনএসও গ্রুপ এমন এক ধরণের কোড উদ্ভাবন করেছে যেটি ব্যবহার করে হোয়াটঅ্যাপ-এ ফোন করলে মনে হবে যেন এটি সত্যিই অন্য আরেকটি হোয়াটস্ অ্যাপ নম্বর থেকে আসছে।

এই কলের মাধ্যমে হ্যাকাররা তাদের টার্গেট করা ফোন সেটটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। যাদের টার্গেট করা হচ্ছে বিষয়টি তাদের কাছে সম্পূর্ণ অজানা থেকে যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা শুধু লক্ষ্য করে যে তাদের হোয়াটস্ অ্যাপ কল লিস্টে কিছু রহস্যজনক মিসডকল জমা হয়েছে।

এনএসও গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগজির উপর নজরদারীর জন্য তার হত্যাকারীদের স্পাইওয়্যার সরবরাহ করা হয়েছিল। তবে এনএসও গ্রুপ এটি অস্বীকার করে বলেছে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তারা আদালতে লড়বে।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে,‘এনএসও গ্রুপের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে প্রযুক্তি সহায়তা দেয়া যাতে তারা সন্ত্রাস এবং গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।’ সূত্র : বিবিসি।

ইসরাইলে তৈরি একটি সফটওয়্যার দিয়ে ভারতের বেশ কয়েকজন সামাজিক কর্মকর্তা, মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকের হোয়াটসঅ্যাপে নজরদারি চালানোর কথা স্বীকার করেছে ফেসবুক মালিকানাধীন মেসেজিং সংস্থাটি।

ইসরাইলে তৈরি একটি সফটওয়্যার দিয়ে ভারতের বেশ কয়েকজন সামাজিক কর্মকর্তা, মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকের হোয়াটসঅ্যাপে নজরদারি চালানোর কথা স্বীকার করেছে ফেসবুক মালিকানাধীন মেসেজিং সংস্থাটি।

পেগাসাস নামের ওই নজরদারি সফটওয়্যার যাদের ফোনে ইন্সটল করা হয়েছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে হোয়াটসঅ্যাপ।

যদিও ওই ইসরাইলি কোম্পানিটি বলেছে, তারা শুধুমাত্র সরকারি এজেন্সিকেই ওই সফটওয়্যার দেয়, তবে ভারত সরকার ওই সফটওয়্যার দিয়ে নজরদারি চালানোর কথা অস্বীকার করছে।

মানবাধিকার কর্মীরা অবশ্য সন্দেহ করছেন যে সরকার-বিরোধী আওয়াজ তুলছেন যারা, তাদের ওপরে কারা নজর রাখছে কোটি কোটি টাকা খরচ করে, সেটা বোঝা কঠিন নয়।

এমনিতে হোয়াটসঅ্যাপে 'এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন' থাকে, যাতে যিনি মেসেজ পাঠাচ্ছেন আর যাকে পাঠানো হচ্ছে - শুধু তারাই দেখতে পারবেন।

কিন্তু পেগাসাস নামের ওই সফটওয়্যারটি যাদের ফোনে ইন্সটল করা হয়েছিল, তাদের 'এনক্রিপশন ব্রিচ' করা হয়েছে বলে হোয়াটসঅ্যাপ নিজেই জানিয়েছে।

যে ভাবে হ্যাকিং হলো
এই নজরদারির শুরু এপ্রিল-মে মাস নাগাদ।

ওই সময়েই হোয়াটসঅ্যাপে একটা ভিডিও কল এসেছিল শুভ্রাংশু চৌধুরীর। তিনি সেটা ধরেছিলেন কী না, তা এখন আর তার মনে নেই ছত্তিসগড় রাজ্যে আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করা বিবিসি-র এই প্রাক্তন সাংবাদিকের।

"অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে আমার কাছে টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা মেসেজ আসে যাতে বলা হয়েছি যে আমার হোয়াটসঅ্যাপে সম্ভবত নজরদারি চলছে। আমি প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু তারপরে বেশ কয়েকবার একই মেসেজ আসায় আমি কয়েকজন পরিচিত সাইবার বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করি।"

"তারাও জানান যে সত্যিই এরকম একটা তদন্ত চালাচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ। তখনই আমাকে জানানো হয় যে ইসরাইলের একটি সংস্থা এই স্পাইওয়্যারটি বানিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপে নজরদারি চালানোর জন্য," বলছিলেন শুভ্রাংশু চৌধুরী।

ওই একই সময়ে হোয়াটসঅ্যাপেই ভিডিও কল এসেছিল আরও বেশ কয়েকজনের কাছে - যাদের কেউ মানবাধিকার কর্মী, কেউ পত্রিকার সম্পাদক বা সাংবাদিক, কেউ দলিত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আর কেউ আবার এমন কয়েকজনের আইনজীবী, যাদের বিরুদ্ধে সরকার বিরোধী কাজের অভিযোগ আনা হয়েছে।

চৌধুরী জানান, টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের 'সিটিজেন ল্যাব' হোয়াটসঅ্যাপের সঙ্গে যৌথভাবে এ বিষয়টি তদন্ত করছিল।

তার কথায়, "এতদিন আমাদের বিষয়টা প্রকাশ না করতে অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু দিন-দুয়েক আগে হোয়াটসঅ্যাপ আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে বলেছে যে সত্যিই আমার ফোনে ওই নজরদারির সফটওয়্যার ইন্সটল হয়েছি একটি ভিডিও কলের মাধ্যমে।"

"আমি জানি না আমার ফোনে রাখা কোন তথ্য ফাঁস হয়েছে বা আদৌ কিছু চুরি হয়েছে কী না। তবে আমার ফোনে এমন কোনো গোপন তথ্য থাকে না যেগুলো কেউ জেনে ফেললে আমার সমস্যা হবে।"

স্পাইওয়্যার কীভাবে কাজ করে?
ভিডিও কলের মাধ্যমেই স্পাইওয়্যারটি মোবাইল ফোনে ইন্সটল হয়ে যায়। যদি সেই ফোন রিসিভও না করা হয়, তবুও সফটওয়্যারটি ফোনে ইন্সটল হয়ে যায় - অর্থাৎ যার ফোনে নজরদারি চালানো হবে বলে টার্গেট করা হয়েছে, তার বিশেষ কিছু করার নেই বলেই মন্তব্য সাইবার বিশেষজ্ঞ প্রশান্ত কুমার রায়ের।

"সাধারণত কোনো লিঙ্কে ক্লিক করলে ফোন বা কম্পিউটারে এরকম স্পাইওয়্যার ইন্সটল হয়ে যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে হোয়াটসঅ্যাপ আর ফোনের অপারেটিং সিস্টেমগুলোর একটা গলদ খুঁজে বার করেছিল ওই সংস্থাটি। সেটা ব্যবহার করে গোটা ফোনেরই দখল নিয়ে নিচ্ছিল তারা। এনক্রিপ্টেড মেসেজ ডিক্রিপ্ট হয়ে যাচ্ছিল আবার ফোনের মাইক আর ক্যামেরা দিয়ে আপনি যা বলছেন বা দেখছেন, সেগুলোও দেখা যাচ্ছিল। হোয়াটসঅ্যাপ অবশ্য এখন সেই গলদটা খুঁজে বার করেছে আর একটা আপডেট দিয়েছে ব্যবহারকারীদের। কিন্তু তার আগেই পৃথিবী জুড়ে বহু মানুষের হোয়াটসঅ্যাপের দখল নিয়ে নিয়েছিল পেগাসাস," বলছিলেন রায়।

হোয়াটসঅ্যাপ বলছে ইসরাইলি সংস্থা এন.এস.ও পেগাসাস নামের ওই স্পাইওয়্যার তৈরি করেছে যা দিয়ে দুদিক থেকেই এনক্রিপ্টেড এই মেসেজিং ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়ে নজরদারি চালানো যায়।

হোয়াটসঅ্যাপ মামলাও করেছে ওই ইসরায়েলি সংস্থাটির বিরুদ্ধে।

এন.এস.ও বিবিসিকে দেয়া এক বিবৃতিতে অবশ্য বলছে, তারা শুধুমাত্র সরকার এবং সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষী বাহিনী এবং গোয়েন্দা দপ্তরগুলোকে এই সফটওয়্যারটি বিক্রি করে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্র হিসাবে।

অভিযোগ অস্বীকার করেছে ভারত সরকার
হোয়াটসঅ্যাপে নজরদারি চালানোর এই ঘটনা সামনে আসার পরে ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিজেপি সরকারের দিকেই আঙ্গুল তুলছে।

ভারত সরকার বলছে, তারা এই নজরদারির সঙ্গে যুক্ত নয়।

কিন্তু মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক বা মাওবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে, সেইসব ব্যক্তি এবং তাদের আইনজীবীদের ওপরে তাহলে কারা নজর রাখছিলেন কোটি কোটি ডলার খরচ করে?

মানবাধিকার আন্দোলনের নেতা সুজাত ভদ্রের কথায়, "এই সর্বগ্রাসী নজরদারি ভারত রাষ্ট্রই চালিয়েছে। যারাই সরকার-বিরোধী কথা বলছে, নির্দিষ্টভাবে তাদের ফোনেই এভাবে নজরদারি চালানো হয়েছে। এখনও হয়তো পুরো তালিকা আমরা পাইনি। কিন্তু সরকার ছাড়া কে এ কাজ করবে?"

"বিষয়টা জানাজানি হতেই দেখছি সরকার একটা বিবৃতি দিয়ে বসল। চারদিকে এত কিছু হয় - কই তখন তো সাত তাড়াতাড়ি বিবৃতি দিতে দেখি না? সেখান থেকেই সন্দেহ হয় যে আরো বেশি তথ্য বেরিয়ে আসা যাতে আটকানো যায়, সেজন্যই আগেভাগে বিবৃতি দিয়ে দিলো সরকার।"

সাইবার বিশেষজ্ঞ প্রশান্ত কুমার রায় বলছেন, "যাদের হোয়াটসঅ্যাপে এই পেগাসাস ইন্সটল করা হয়েছিল, তারা যা কাজকর্ম করেন, সেকারণেই ভারতের রাষ্ট্রীয় এজেন্সিগুলি এই নজরদারিতে যুক্ত আছে বলে সন্দেহ হচ্ছে। এরা সকলেই সামাজিক কর্মকর্তা বা সাংবাদিক বা আইনজীবী যারা দলিত আর আদিবাসীদের সঙ্গে কাজ করেন।"

"আমি তো অনেক ভেবেও এমন কোনও দেশের নাম খুঁজে পেলাম না যাদের এই কয়েকজনের কাজকর্ম নিয়ে আগ্রহ থাকার বিন্দুমাত্র কারণ আছে। এমন কি পাকিস্তানও বা কেন এদের ব্যাপারে আগ্রহী হবে?"

শুভ্রাংশু চৌধুরী বলছিলেন, "আমি জানি না কে বা কারা আমার ফোনে নজরদারি চালাচ্ছিল। তবে যেই করে থাকুক সেটা বেআইনি এবং আমার ব্যক্তিগত পরিসরে সরাসরি হস্তক্ষেপ।"

তার কথায়, "আমরা মাওবাদী অধ্যুষিত অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার কথা বলি - ছত্তিশগড়ের আদিবাসীদের তাদের নিজেদের সমস্যার কথা সরকারের কাছে তুলে ধরার কাজ করি। তাই আমরা চাই সরকার সেগুলো শুনুক।"

"কিন্তু সেই কথাবার্তা শোনা যদি আইনি উপায়ে হত, আমার কোনও আপত্তি ছিল না। কিন্তু বেআইনিভাবে কেউ কেন আমার কাজের ওপরে নজরদারি চালাবে?"