Wednesday, November 14, 2018

যৌন আসক্তি ও একজন নীলার স্বীকারোক্তি- প্রথম পর্ব

মধ্য এশিয়ায় ১৫ বছর কাটিয়ে যুক্তরাজ্যে নীলার প্রথম চাকরি ছিল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ট্রেডিং ফ্লোরে। তার ভাষায়, এই প্রতিষ্ঠানে পুরুষদের আধিপত্য বেশি, যারা কিনা বোনাসই কামান মিলিয়ন পাউন্ডের অঙ্কে। পুরো দলে মাত্র দু’ জন নারী ছিলেন। একজন নীলা। তাদের পুরুষ সহকর্মীরা প্রায়ই সভাকক্ষের বড় পর্দায় পর্নোগ্রাফি চালিয়ে তাদেরকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করতেন। অথচ, এই বড় পর্দার কাজ হলো বাজারদরের তথ্য প্রদর্শন করা।
নীলা বলেন, ‘আমার এটা পছন্দ হয়নি। কিন্তু আমার ক্যারিয়ার সবে শুরু হয়েছে। শহরে মাত্র নিজের জায়গা করে নিচ্ছি।

https://www.youtube.com/watch?v=LUwj1-1-M1Q



বেতনও পেতাম ভালো। চাকরিটাও আকর্ষণীয়। আমি এই চাকরি হারাতে চাই নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি জানতাম অফিসের পুরুষরা আমার কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া আশা করতেন। তারা আমাকে বিস্মিত করে দিতে চাইতো। পর্নো দেখে যাতে হতভম্ব না হই, সেজন্য আমি বাসায় ফিরে নিজেই পর্নো ভিডিও দেখতে শুরু করলাম। যাতে করে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। অফিসের প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পারি।’
কিন্তু খুব দ্রুতই নীলা পটে গেলেন। সামাজিকভাবে রক্ষণশীল আবহে তার বড় হয়ে উঠা। তার পরিবারে যৌনতা নিয়ে কখনই আলোচনা হয় নি। ফলে ওই পরিস্থিতিতে ‘অসহায়’ হয়ে পড়েন তিনি।
প্রতিদিনই তিনি ভাবতে থাকেন বাসায় কত দ্রুত যাবেন। গিয়ে পর্নো ভিডিও দেখবেন আর সেক্স টয় নিয়ে স্বমেহন করবেন।
তার ভাষায় প্রক্রিয়াটা এমন: ‘প্রথমে বেশ ধীরে শুরু হয়। আপনি উত্তেজিত হয়ে উঠেন। এরপর আপনি দেখতে থাকবেন। পাশাপাশি নিজের সরঞ্জাম নেওয়া শুরু করবেন। এমন উত্তেজনাকর কিছু দেখে আপনার সকল অনুভূতি বেশ তীব্র হয়ে উঠবে। আপনার মন চলে গেল হাতের দিকে। ওই যন্ত্রের বাটন না চাপলে শান্তি হবে না। আপনি জানেন যে, আপনিই এটার নিয়ন্ত্রণে আছেন। আপনার সুখানুভূতির নিয়ন্ত্রণে। আর এটার মাধ্যমে যে ধরণের অরগাজম হবে, তা অন্য কোনো মানুষের কাছ থেকে পাওয়া যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বমেহন শুরু ও শেষ হতে বড়জোর ৫ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু আপনি এরপর লেগে থাকবেন এতে। কারণ, এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি থেকে আপনি বেরোতে চান না। এটা যেন নেশার মতো।’
এই পদ্ধতিতে তিনি সপ্তাহের প্রতিটি দিন গড়ে ২-৩ ঘণ্টা করে পর্নো দেখতেন। তার ব্যবহার ক্রমেই পীড়নকর হয়ে উঠলো। তিনি যদি পর্নো দেখতে না পারতেন, তাহলে মন আকুল হয়ে উঠতো। পুরো বিষয়টি তার জন্য যতই ক্ষতিকর হচ্ছিল, ততই তিনি বিষয়টির পক্ষে নিজের মনকে বোঝাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতেন। তিনি নিজেকে নিজে বলতেন, ‘পুরো বিষয়টি নিরাপদ। পর্নো দেখে আপনার যৌন রোগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আপনার এত কষ্ট করে মেইক আপ করতে হবে না। আপনার শর্তানুযায়ীই সব হবে, কিন্তু ফলাফল একেবারে শতভাগ নিশ্চিত।’
কিন্তু এই শতভাগ নিশ্চিত ফল পেতে তার পর্নো দেখার অভ্যাস ক্রমেই বাজে হয়ে উঠলো। তিনি ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর পর্নো দেখতে লাগলেন। তার ভাষ্য, ‘প্রথম প্রথম আপনি হয়তো সাধারণ পর্নো দেখবেন। কিন্তু কয়েকদিন পর এটাতে আর কাজ হবে না। আপনি এ ধরণের পর্নোতে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। এটা যেন মাদক সেবনের মতো। ডোজ বাড়াতে হবে আপনাকে। ফলে আপনি আরও কড়া ধাঁচের পর্নো দেখতে থাকবেন।’ 
নীলার কাছে এক পর্যায়ে বিষয়টি বেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠলো। তিনি নিজেই চিন্তিত হয়ে উঠলেন, তিনি কি তাহলে বিকৃত মস্তিষ্কের কেউ!
যারাই নিজেকে যৌন আসক্ত মনে করেন তাদের এই মনোভাবের পেছনে এই লজ্জা একটি বড় কারণ। এই লজ্জাবোধের কারণে নিজেদেরকে যেমন আড়াল করে ফেলতে ইচ্ছা করে, তেমনি ওই তাড়নাও আরও জাগ্রত হয়ে উঠে। নীলার ভাষায়, ‘এ যেন উত্তেজিত হওয়া ও লজ্জার সংমিশ্রণ।’
পর্নো দেখার ফলে পুরুষের প্রতিও নীলার আচরণ পরিবর্তিত হয়ে উঠলো। অর্থাৎ, তিনি যখন সম্ভাব্য সঙ্গী খুঁজতেন, তখন তাদের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলো। তিনি বলেন, ‘আমি যেন লোকটার শার্টের ভেতর দিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম তার শরীরটা সিক্স-প্যাক কিনা। যুক্তরাজ্যের পুরুষদের গোপনাঙ্গের যে গড় আকার, তা আমার জন্য যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু এটা তো জীবনসঙ্গী বাছার ভালো কোনো উপায় নয়।’ এ কারণে বেশ কয়েকটি ব্যর্থ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাকে। 
একসময় নীলা আবিষ্কার করলেন, আগের কোনো ধরণেরই পর্নো ফিল্ম তাকে আকৃষ্ট করে না। তিনি এখন উত্তেজিত হওয়ার জন্য সেসব ছবি দেখতে বাধ্য হচ্ছেন যেখানে নারীদের প্রতি সহিংস আচরণ করা হয়। এই বিষয়টি ভেবে তিনি আতঙ্কিত হয়ে উঠেন।
তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হলাম, এরপর আমি আর কত নিচে নামবো? আমি কি এরপর মানুষ খুনের ভিডিও দেখবো আমার আসক্তি কাটানোর জন্য?’
নীলা এরপর লন্ডন ছেড়ে যান। তিনি নিজেকে একজন মানসিক পরামর্শদাতা হিসেবে প্রশিক্ষিত করে তোলেন। বর্তমানে তার বয়স চল্লিশের কোটায়। 
যেসব রোগী নিজেকে যৌন আসক্ত বলে মনে করেন তাদের চিকিৎসায় তিনি অভিজ্ঞ। মধ্য লন্ডনের লরেল সেন্টারে তিনি কাজ করেন। যুক্তরাজ্যে অল্প যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ ধরণের বিশেষ চিকিৎসা সেবা দেয় তার মধ্যে এটি একটি।
কিন্তু এই চিকিৎসা পেতে হলে আপনাকে মোটা অঙ্কের অর্থ গুনতে হবে। কারণ, যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা কর্তৃপক্ষ যৌন আসক্তিকে রোগ হিসেবে এখনও স্বীকৃতি দেয় না। তবে অনুমান করা হয় যে, যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর হাজার হাজার না হলেও শ’ শ’ রোগী এই চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদের বড় অংশই পুরুষ।
(এই নিবন্ধটি বিবিসি থেকে নেওয়া হয়েছে। আগামী পর্বে সমাপ্য।) 

যৌন আসক্তির অস্তিত্ব কি সত্যিই আছে?

যুক্তরাজ্যে যৌন আসক্তির জন্য যারা চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের বেশিরভাগই পুরুষ। এর একটি কারণ হতে পারে এই যে, নারীরা বিষয়টি নিয়ে বেশি লজ্জায় ভোগেন এবং সমস্যাটি স্বীকার করতে বেশি অস্বস্তিতে পড়েন। ব্যাখ্যা যা-ই হোক না কেন, অন্য দশজনের সঙ্গে পলের সমস্যা অনেকখানি মিলে যায়। 
তিনি একজন পুরুষ। কিন্তু নীলার মতো শুধু পর্নো দেখে নয় বরং একের পর এক শারীরিক সম্পর্ক করতে করতেই এক ধরণের আসক্তি জন্মায় তার মধ্যে।
তার এখন বয়স পঞ্চাশের কোটায়। তিনি জানান, তার আসক্তি শুরু হয় ৩০ বছর আগে, যখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। বান্ধবীর সঙ্গে মধুর সম্পর্ক ছিল তার। কিন্তু একদিন তার মনে হলো, এটাই যথেষ্ট নয়।

পলের ভাষ্য, ‘আমি তাকে ভালবাসতাম। সত্যিই বাসতাম। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আমি পতিতাসঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। আমি উত্তেজনাকর শারীরিক সম্পর্কের জন্য পাগলপ্রায় হয়ে পড়ি। কিন্তু আমার মনে হতো যে, এটা আমার করা উচিত নয়। আমি কখনই তার (বান্ধবী) সঙ্গে প্রতারণা করার মানসিকতায় ছিলাম না, কিন্তু এই বিষয়টি ভিন্ন মনে হতো।’
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পলের ব্যবহার পুরোপুরি পাল্টে গেল।
তার ভাষ্য, ‘আমার তখন একই সময়ে ছয় বান্ধবী ছিল। আবার প্রতি সপ্তাহে আমি ২-৩ জন যৌনকর্মীর কাছে যেতাম। এটা যেন ক্ষুধা লাগলে পিজ্জা অর্ডার করার মতো। আমার ক্ষুধা লাগলো, অর্ডার করলাম। খেলাম, এরপর ভুলে গেলাম।’
পলের মনে হতে লাগলো, নিশ্চয়ই কোথাও গড়বড় হচ্ছে। তখন সবে তার মাথায় এসেছে যে, এ বিষয়টি নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। প্রয়োজনে সাহায্য নেওয়া দরকার। আর তখনই তিনি লন্ডনে নিজের প্রথম চাকরি বাগিয়ে নেন। সেখানে নিজেকে তিনি এমন পরিবেশে খুঁজে পেলেন যেখানে এ ধরণের আচরণকে বরং উৎসাহ দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘জীবনটা অবিশ্বাস্য ছিল। কনকর্ডে চড়ে বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়ানো। প্রচুর টাকা কামানো। লন্ডনের নাচের ক্লাব আর বারে ঘুরে বেড়ানো। সবই ছিল। এছাড়াও নিজের সহকর্মীদের সঙ্গেও যৌন সম্পর্কে জড়ানোর উত্তেজনাকর অভিজ্ঞতা তো ছিলই।’
পল আরও বলেন, ‘এই পর্যায়ে এসে আমার মনে হলো, আমার বোধ হয় কোনো সমস্যা নেই। আমি হয়তো সাধারণ মানুষদের মতোই।’
কিন্তু এরপরও তার মাথায় এক ধরণের সংশয় রয়ে গেল। রাতে কোনো সহকর্মীর সঙ্গে থেকে আবার স্ট্রিপিং ক্লাব-বারে যাওয়া হতো। প্রতি রাতে খরচ হয়ে যেত ১ হাজার পাউন্ড। কেউ হয়তো মঙ্গলবারে যেত, কেউ আবার বৃহস্পতিবার। কিন্তু পল ছিলেন সহকর্মীদের মধ্যে একমাত্র ব্যক্তি যিনি ফের শনিবারেও যেতেন।
নীলার মতো তিনিও ক্রমেই অধিকতর উত্তেজনার পেছনে ছুটতে লাগলেন। আর তাড়না এত বেশি কাজ করতো যে, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তিনি ১০ বছর পুরুষদের সঙ্গেও অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি নারী থেকে পুরোপুরি পুরুষদের প্রতি ঝুঁকে গেলাম। আমার সব ধরণের শারীরিক সম্পর্ক হতে লাগলো পুরুষদের সঙ্গে। আমি সৎভাবে বলতে পারি, আমার মধ্যে সমকামিতার লেশমাত্র ছিল না। শুধু বেশি উত্তেজনার জন্য আমি এত নীচে নামলাম। অথচ, এই সময়টাতে আমার ভাগ্যে অনেক অনেক ভালো বান্ধবী জুটেছে। কিন্তু আমি তাদেরকে পরিত্যাগ করি।’
নীলার মতো পলও বেশ পীড়নকর পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন। শারীরিক সম্পর্ক না করতে পারলে, তিনি পাগলপ্রায় হয়ে যেতেন। অর্গাজমে পৌঁছানো তার যৌনক্রিয়ার উদ্দেশ্য ছিল না। বরং, পারিপার্শ্বিক অনেক কিছুর ওপর বিমোহিত থাকতেন তিনি। নীলার মতো তিনিও এই যৌন অভিজ্ঞতা কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতেন।

পল প্রথমবার পর্নো দেখেছেন ১২ বছর বয়সে। কিন্তু তখনও এতে আসক্ত হন নি। তিনি বলেন, ‘আমি কিছু ম্যাগাজিন পাই ছোটবেলায়। বাবা-মা বাইরে থাকলে সেগুলো দেখেছি। কিন্তু তখন তেমন কোনো যৌন অনুভূতি আমি বোধ করি নি।’
কিন্তু উচ্চগতির ইন্টারনেট যখন এল তখন সব পাল্টে গেল। ওই সময়ে তিনি যৌনকর্মী ছেড়ে অনলাইনে পর্নো দেখা শুরু করলেন। দেখতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
লরেল সেন্টার থেকে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা পেয়েছেন পল। তার ধারণা, তিনি সুস্থ হওয়ার পথে। বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি যৌনকর্মীর কাছে যান নি। অনেক মাস হয়ে গেল পর্নোও দেখেন নি। তার লক্ষ্য হলো একজন নারীর সঙ্গে ঘর বাঁধা।
তার ভাষ্য, ‘এটা এক একাকী রোগ। আপনি এক পর্যায়ে এসে ভাববেন যে দুনিয়াতে আপনার সময় খুব সীমিত। আমি কখনই এমন কারও সঙ্গে উপভোগ্য যৌন সম্পর্কে জড়াতে পারি নি যাদেরকে আমি ভালোবাসি। গত ৩০ বছরে এটাই আমার জীবনে আসে নি।’
এই বছরের জুনে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে যৌন আসক্তিকে রোগের আন্তর্জাতিক শ্রেণীবিভাগে যুক্ত করেছে। সংস্থাটি এর নাম দিয়েছে ‘কমপালসিভ সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার ডিজঅর্ডার।’

আমি যেসব থেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বলেছি এই সংজ্ঞায়নও যথেষ্ট নয়। কারণ, একে ঠিক আসক্তি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় নি। কিন্তু এর দরুন যুক্তরাজ্য সরকার হয়তো জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার অধীনে এই রোগের জন্য কাউন্সেলিং সেবা প্রদানে উৎসাহিত হতে পারে।
গত কয়েক সপ্তাহে আমি এমন অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি যাদের ধারণা তারা যৌন আসক্ত। এই সমস্যাকে আসক্তি হিসেবে আমরা বলি, আর না বলি, এটা স্পষ্ট যে এই মানুষগুলোর সহায়তা প্রয়োজন। তারা এমন সমস্যায় ভুগছেন যার দরুন তাদের জীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এই সমস্যায় ভুগছেন এমন যাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, তাদের প্রত্যেকেই অনুমতিসাপেক্ষ যৌনক্রিয়া ও ধর্ষণের পার্থক্য বুঝতেন। তারা যখন সমস্যার চূড়ায় ছিলেন, তখনও তারা এই পার্থক্য বুঝেছেন। এদের কেউই ধর্ষণ করেন নি। যৌন আসক্তরা মূলত নিজের ও সঙ্গীর ক্ষতি করেন। কিন্তু যৌন শিকারিরা ভিকটিমদের নির্যাতন করেন ও একে আবার আড়াল করার চেষ্টা করেন।
(গতকালের পর্বের পর। বিবিসি থেকে অনূদিত।) 

Tuesday, November 6, 2018

যেসব খাবারে কমে এসিডিটি


গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটির সমস্যায় ভুগছেন না এমন মানুষ পাওয়া আজ কঠিন-ই বটে! ছোটা-বড় সব বয়সের  মানুষের মাঝেই এই সমস্যাটি এখন প্রকট। অনিয়মিত খাবার গ্রহণ ও উল্টাপাল্টা খাবার খাওয়ার কারণেই তাদেরকে এ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

তবে একটু নিয়ম করে জীবনযাপন করলেই এ থেকে উত্তরণ সম্ভব। সেইসঙ্গে কিছু বিশেষ খাবার রয়েছে যেগুলো গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূরীকরণে ভূমিকা রাখে। নিচে সেসব খাবার নিয়েই আলোচনা করা হলো :

আদা : 
আদা এমন একটি ভেষজ উপাদান যা আমাদের অনেক কাজে লাগে। প্রতিবার খাদ্য গ্রহণের আধা ঘণ্টা আগে ছোট এক টুকরো আদা খেলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা চলে যাবে।

লং :  
লং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভালো কাজ দেয়। দুইটি লং মুখে নিয়ে চিবালে এর রসটা আপনার এসিডিটি দূর করতে সাহায্য করবে।

তুলসী পাতা : 
হাজারো গুণে গুণান্বিত তুলসী পাতা। এসিডিটি দূর করতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ৫-৬ টি তুলসী পাতা চিবিয়ে খেলে দেখবেন এসিডিটি কমে গেছে।

এমনকি তুলসী পাতা প্রতিদিন ব্লেন্ড করে পানি দিয়ে খেলে তার এসিডিটি হওয়ার প্রবনতা একেবারেই কমে যাবে।

পুদিনা পাতা: 
গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করতে পুদিনা পাতার রসও বহুদিন ধরেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রতিদিন পুদিনা পাতার রস বা পাতা চিবিয়ে খেলে এসিডিটি ও বদহজম দূর হয়।

জিরা : 
এক চা চামচ জিরা ভেজে নিয়ে একটু ভেঙ্গে নিন। এরপর এই গুড়াটি একগ্লাস পানিতে মিশিয়ে প্রতিবার খাবারের সময় পান করুন। দেখবেন, ম্যাজিকের মতো কাজ করবে।

গুঁড় : 
গুঁড় বুক জ্বালাপোড়া এবং এসিডিটি থেকে মুক্তি দিতে পারে। যখন বুক জ্বালাপোড়া করবে সঙ্গে সঙ্গে এক টুকরো গুঁড় মুখে নিয়ে সম্পূর্ণ গলে না যাওয়া পর্যন্ত রাখুন। তাতে ভালো ফল পাবেন। তবে ডায়বেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এটি নিষিদ্ধ।

বোরহানী : 
টক দই, বীট লবণ ইত্যাদি নানা এসিড বিরোধী উপাদান দিয়ে তৈরি হয় বোরহানী। তাই এটি হজমে খুবই সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন ভারি খাবারের পর একগ্লাস করে খেলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা অনেকাংশে দূর হবে।

দুধ : 
দুধও এসিডিটি কমাতে সাহায্য করে। কারণ দুধে আছে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম যা পাকস্থলীর এসিড কমাতে সাহায্য করে। রাতে একগ্লাস দুধ ফ্রিজে রেখে পরদিন সকালে খালি পেটে খেলে সারাদিন এসিডিটি থেকে মুক্ত থাকা যায়। তবে কারও পেট দুধের প্রতি অতিসংবেদনশীল হলে তাদের দুধ না খাওয়াই ভালো।

মাঠা : 
দুধ এবং মাখন দিয়ে তৈরি মাঠা একসময় আমাদের দেশে খুবই জনপ্রিয় ছিল। সামান্য গোলমরিচের গুঁড়া যোগ করলে এসিডিটি দূর করতে এটি টনিকের মতো কাজ করে।

বিডি প্রতিদিন/হিমেল

Monday, November 5, 2018

ইন্দিরা গান্ধীকে যেভাবে গুলিতে ঝাঁঝরা করেছিল দুই দেহরক্ষী

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তারই দুই দেহরক্ষীর গুলিতে প্রাণ হারান আজ থেকে ৩৪ বছর আগে। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। স্বর্ণ মন্দিরে সেনা অপারেশনের বদলা নিয়েছিল তারা প্রধানমন্ত্রীকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়। কেমন ছিল সেই দিনটি, কীভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছিল- বিভিন্ন বই পড়ে তারই একটি বিবরণ তুলে ধরেছেন বিবিসির হিন্দি বিভাগ।

ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর শহরের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর বেশ কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তবে বেশিরভাগ স্মৃতিই আনন্দের নয়। এই শহরেই তার বাবা জওহরলাল নেহরু প্রথমবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তারপরেই ১৯৬৪ সালের মে মাসে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনী প্রচারে এই শহরেই ইন্দিরা গান্ধীর দিকে একটা পাথর ছোঁড়া হয়েছিল, যাতে তার নাক ফেটে গিয়েছিল। সেই ভুবনেশ্বর শহরেই ১৯৮৪ সালের ৩০ অক্টোবর জীবনের শেষ ভাষণটা দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। প্রতিটা ভাষণের মতোই ওই ভাষণও লিখে দিয়েছিলেন মিসেস গান্ধীর মিডিয়া উপদেষ্টা এইচ ওয়াই শারদা প্রসাদ। কিন্তু ভাষণ দিতে দিতে হঠাৎই লেখা বয়ান থেকে সরে গিয়ে নিজের মতো বলতে শুরু করেন ইন্দিরা। তার বলার ধরনও পাল্টে গিয়েছিল সেদিন।
তিনি বলেছিলেন, “আমি আজ এখানে রয়েছি। কাল নাও থাকতে পারি। এটা নিয়ে ভাবি না যে, আমি থাকলাম কী না। অনেকদিন বেঁচেছি। আর আমার গর্ব আছে যে, আমি পুরো জীবনটাই দেশের মানুষের সেবায় কাজে লাগাতে পেরেছি বলে। আর শেষ নিশ্বাসটা নেওয়া পর্যন্ত আমি সেটাই করে যাব। আর যেদিন মরে যাব, আমার রক্তের প্রতিটা ফোঁটা ভারতকে আরও মজবুত করার কাজে লাগবে।” 
কখনও কখনও বোধহয় শব্দের মাধ্যমেই নিয়তি ভবিষ্যতের একটা ইশারা দিয়ে দেয়। ভাষণের শেষে যখন মিসেস গান্ধী রাজ্যপালের আবাস রাজভবনে ফিরেছেন, তখন রাজ্যপাল বিশ্বম্ভরনাথ পান্ডে তাকে বলেছিলেন, “একটা রক্তাক্ত মৃত্যুর কথা বলে আপনি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছেন।” 
“আমি যা বলেছি, তা নিজের মনের কথা। এটা আমি বিশ্বাস করি,” জবাব দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। সেই রাতেই দিল্লি ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। খুব ক্লান্ত ছিলেন। সারা রাত প্রায় ঘুমাননি। পাশের ঘরে সোনিয়া গান্ধী ঘুমাচ্ছিলেন। ভোর প্রায় চারটে নাগাদ শরীরটা খারাপ লাগছিল সোনিয়ার। বাথরুমের দিকে যাচ্ছিলেন। সেখানে ওষুধও রাখা থাকত। সোনিয়া গান্ধী নিজের বই ‘রাজীব’-এ লিখেছেন, “উনিও আমার পেছন পেছন বাথরুমে চলে এসেছিলেন। ওষুধটা খুঁজে দিয়ে বলেছিলেন, শরীর বেশী খারাপ লাগলে যেন একটা আওয়াজ দিই। উনি জেগেই আছেন।” 
সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে তৈরি হয়ে গিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। কালো পাড় দেওয়া একটা গেরুয়া রঙের শাড়ি পরেছিলেন মিসেস গান্ধী সেদিন। দিনের প্রথম অ্যাপয়েন্টমেন্টটা ছিল পিটার উস্তিনভের সঙ্গে। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর ওপরে একটা তথ্যচিত্র বানাচ্ছিলেন সেই সময়ে। আগের দিন ওড়িশা সফরের সময়েও তিনি শুটিং করেছিলেন। দুপুরে মিসেস গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জেমস ক্যালিঘান আর মিজোরামের এক নেতার সঙ্গে। সন্ধেবেলায় ব্রিটেনের রাজকুমারী অ্যানের সম্মানে একটা ডিনার দেওয়ার কথা ছিল মিসেস গান্ধীর।
তৈরি হয়েই ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসেছিলেন তিনি। দুটো পাউরুটি টোস্ট, কিছুটা সিরিয়াল, মুসাম্বির জুস আর ডিম ছিল সেদিনের ব্রেকফাস্টে। জলখাবারের পরেই মেকআপ ম্যান তার মুখে সামান্য পাউডার ব্লাশার লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তখনই হাজির হন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাক্তার কে পি মাথুর। রোজ ওই সময়েই মিসেস গান্ধীকে পরীক্ষা করতে যেতেন তিনি। ভেতরে ডেকে নিয়েছিলেন ডাক্তার মাথুরকে। হাসতে হাসতে বলেছিলেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগান কী রকম অতিরিক্ত মেকআপ করেন, যখন ৮০ বছর বয়সেও তার মাথার বেশির ভাগ চুল কালোই রয়েছে।
ঘড়িতে যখন ন’টা বেজে দশ মিনিট, ইন্দিরা গান্ধী বাইরে বের হলেন। বেশ রোদ ঝলমলে দিনটা। তবুও রোদ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে আড়াল করতে সেপাই নারায়ণ সিং একটা কালো ছাতা নিয়ে পাশে পাশে হাঁটছিলেন। কয়েক পা পেছনেই ছিলেন ব্যক্তিগত সচিব আর কে ধাওয়ান আর তারও পেছনে ছিলেন ব্যক্তিগত পরিচারক নাথু রাম। সকলের পেছনে আসছিলেন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অফিসার, সাব ইন্সপেক্টর রামেশ্বর দয়াল। ঠিক সেই সময়েই সামনে দিয়ে এক কর্মচারী হাতে একটা চায়ের সেট নিয়ে পেরিয়ে গিয়েছিলেন। ওই চায়ের সেটে তথ্যচিত্র নির্মাতা পিটার উস্তিনভকে চা দেওয়া হয়েছিল। ওই কর্মচারীকে ডেকে ইন্দিরা বলেছিলেন মি. উস্তিনভের জন্য যেন অন্য আরেকটা চায়ের সেট বার করা হয়। বাসভবনের লাগোয়া দপ্তর ছিল আকবর রোডে। দুটি ভবনের মধ্যে যাতায়াতের একটা রাস্তা ছিল। সেই গেটের সামনে পৌঁছে ইন্দিরা গান্ধী তার সচিব আর কে ধাওয়ানের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
মি. ধাওয়ান তাকে বলছিলেন যে ইন্দিরার নির্দেশমতো ইয়েমেন সফররত রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিংকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে তিনি সন্ধ্যে সাতটার মধ্যেই দিল্লি চলে আসেন। পালাম বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতিকে রিসিভ করে সময়মতো যাতে রাজকুমারী অ্যানের ভোজসভায় পৌঁছাতে পারেন ইন্দিরা, সেই জন্যই ওই নির্দেশ। হঠাৎই পাশে দাঁড়ানো নিরাপত্তাকর্মী বিয়ন্ত সিং রিভলবার বার করে ইন্দিরা গান্ধীর দিকে গুলি চালায়। প্রথম গুলিটা পেটে লেগেছিল। ইন্দিরা গান্ধী ডান হাতটা ওপরে তুলেছিলেন গুলি থেকে বাঁচতে। তখন একেবারে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে বিয়ন্ত সিং আরও দুবার গুলি চালায়। সে-দুটো গুলি তার বুকে আর কোমরে লাগে। ওই জায়গার ঠিক পাঁচ ফুট দূরে নিজের টমসন অটোমেটিক কার্বাইন নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সতবন্ত সিং। ইন্দিরা গান্ধীকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখে সতবন্ত বোধহয় কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিল। স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে ছিল। তখনই বিয়ন্ত চিৎকার করে সতবন্তকে বলে ‘গুলি চালাও।’ সতবন্ত সঙ্গে সঙ্গে নিজের কার্বাইন থেকে চেম্বারে থাকা ২৫টা গুলিই ইন্দিরা গান্ধীর শরীরে গেঁথে দিয়েছিল। বিয়ন্ত সিং প্রথম গুলিটা চালানোর পরে প্রায় ২৫ সেকেন্ড কেটে গিয়েছিল ততক্ষণে।
নিরাপত্তা কর্মীরা ওই সময়টায় কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাননি, এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন সবাই। তারপরে সতবন্ত সিং গুলি চালাতে শুরু করতেই একদম পিছনে থাকা নিরাপত্তা অফিসার রামেশ্বর দয়াল দৌড়ে এগিয়ে আসেন। সতবন্ত তখন একনাগাড়ে গুলি চালিয়ে যাচ্ছেন। মি. দয়ালের উরু আর পায়েও গুলি লাগে। সেখানেই পড়ে যান তিনি। ইন্দিরা গান্ধীর আশপাশে থাকা অন্য কর্মচারীরা ততক্ষণে একে অন্যকে চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছেন।
ওদিকে এক নম্বর আকবর রোডের ভবন থেকে পুলিশ অফিসার দিনেশ কুমার ভাট এগিয়ে আসছিলেন শোরগোল শুনে। বিয়ন্ত সিং আর সতবন্ত সিং তখনই নিজেদের অস্ত্র মাটিতে ফেলে দিয়েছে। বিয়ন্ত বলেছিল, “আমাদের যা করার ছিল, সেটা করেছি। এবার তোমাদের যা করার করো।” ইন্দিরার আরেক কর্মচারী নারায়ণ সিং সামনে লাফিয়ে পড়ে বিয়ন্ত সিংকে মাটিতে ফেলে দেন। পাশের গার্ডরুম থেকে বেরিয়ে আসা ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বা আই টি বি পির কয়েকজন সদস্য দৌড়ে এগিয়ে এসে সতবন্ত সিংকেও ঘিরে ফেলে। সবসময়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স রাখা থাকত ওখানে। ঘটনাচক্রে সেদিনই অ্যাম্বুলেন্সের চালক কাজে আসেননি। ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মাখনলাল ফোতেদার চিৎকার করে গাড়ি বার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
মাটিতে পড়ে থাকা ইন্দিরাকে ধরাধরি করে সাদা অ্যাম্বাসেডর গাড়ির পিছনের আসনে রাখেন আর কে ধাওয়ান আর নিরাপত্তা কর্মী দিনেশ ভাট। সামনের আসনে, ড্রাইভারের পাশে চেপে বসে পড়েন মি. ধাওয়ান আর মি. ফোতেদার। গাড়ি যেই চলতে শুরু করেছে, সোনিয়া গান্ধী খালি পায়ে, ড্রেসিং গাউন পরে ‘মাম্মি, মাম্মি’ বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে আসেন। ইন্দিরা গান্ধীকে ওই অবস্থায় দেখে সোনিয়া গান্ধীও গাড়ির পিছনের আসনে চেপে পড়েন। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল ইন্দিরা গান্ধীর শরীর। সোনিয়া তার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নেন। খুব জোরে গাড়িটা ‘এইমস’ বা অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট ফর মেডিক্যাল সায়েন্সের দিকে এগোতে থাকে। চার কিলোমিটার রাস্তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই পেরিয়ে যায়। সোনিয়া গান্ধীর ড্রেসিং গাউনটা ততক্ষণে ইন্দিরা গান্ধীর রক্তে পুরো ভিজে গেছে। ওই গাড়িটা ‘এইমস’এ ঢুকেছিল ন’টা ৩২ মিনিটে।
ইন্দিরা গান্ধীর রক্তের গ্রুপ ছিল ও নেগেটিভ। ওই গ্রুপের যথেষ্ট রক্ত মজুত ছিল হাসপাতালে। কিন্তু সফদরজং রোডের বাসভবন থেকে কেউ ফোন করে হাসপাতালে খবরও দেয়নি যে ইন্দিরা গান্ধীকে গুরুতর আহত অবস্থায় এইমস-এ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জরুরী বিভাগের দরজা খুলে গাড়ি থেকে ইন্দিরা গান্ধীকে নামাতে মিনিট তিনেক সময় লেগেছিল। কিন্তু সেখানে তখন কোনও স্ট্রেচার নেই। কোনওরকমে একটা স্ট্রেচার যোগাড় করা গিয়েছিল। গাড়ি থেকে তাকে নামানোর সময়ে ওই অবস্থা দেখে সেখানে হাজির ডাক্তাররা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। ফোন করে সিনিয়র কার্ডিয়োলজিস্টদের খবর দেওয়া হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডাক্তার গুলেরিয়া, ডাক্তার এম এম কাপুর আর ডাক্তার এস বালারাম ওখানে পৌঁছে যান। ইসিজি করা হয়েছিল, কিন্তু তার নাড়ীর স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছিল না। চোখ স্থির হয়ে গিয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছিল যে, মস্তিষ্কে আঘাত লেগেছে। একজন চিকিৎসক মুখের ভেতর দিয়ে একটা নল ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যাতে ফুসফুস পর্যন্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে। মস্তিষ্কটা চালু রাখা সবথেকে প্রয়োজন ছিল তখন। ৮০ বোতল রক্ত দেওয়া হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীকে। শরীরে যে পরিমাণ রক্ত থাকে, এটা ছিল তার প্রায় ৫ গুণ।
ডাক্তার গুলেরিয়া বলছেন, “আমি তো দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম যে উনি আর নেই। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার জন্য ইসিজি করতে হয়েছিল। তারপরে আমি ওখানে হাজির স্বাস্থ্যমন্ত্রী শঙ্করানন্দকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এখন কী করণীয়? ঘোষণা করে দেব আমরা যে উনি মৃত? তিনি না বলেছিলেন। তখন আমরা মিসেস গান্ধীকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাই।” 
চিকিৎসকরা ‘হার্ট এন্ড লাং মেশিন’ লাগিয়েছিলেন ইন্দিরার শরীরে। ধীরে ধীরে তার শরীরে রক্তের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি থেকে কমে ৩১ ডিগ্রি হয়ে গেল। তিনি যে আর নেই, সেটা সকলেই বুঝতে পারছিল, কিন্তু তবুও ‘এইমস’এর আটতলার অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে।
চিকিৎসকেরা দেখেছিলেন যে, যকৃতের ডানদিকের অংশটা গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। বৃহদান্ত্রের বাইরের অংশটা ফুটো হয়ে গেছে। ক্ষতি হয়েছে ক্ষুদ্রান্ত্রেরও। ফুসফুসের একদিকে গুলি লেগেছিল আর পাঁজরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল গুলির আঘাতে। তবে হৃৎপিণ্ডতে কোনও ক্ষতি হয়নি। দেহরক্ষীদের গুলিতে ছিন্নভিন্ন হওয়ার প্রায় চার ঘণ্টা পর, দুপুর দুটো ২৩ মিনিটে ইন্দিরা গান্ধীকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারি প্রচারমাধ্যমে সেই ঘোষণা করা হয়েছিল সন্ধ্যা ছ’টার সময়ে।
ইন্দিরা গান্ধীর জীবনীকার ইন্দর মালহোত্রা বলছেন, গোয়েন্দা এজেন্সিগুলো আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, মিসেস গান্ধীর ওপরে এরকম একটা হামলা হতে পারে। তারা সুপারিশ পাঠিয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রীর আবাস থেকে সব শিখ নিরাপত্তা-কর্মীদের যেন সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সেই ফাইল যখন ইন্দিরা গান্ধীর টেবিলে পৌঁছায়, তখন ভীষণ রেগে গিয়ে তিনি নোট লিখেছিলেন, ‘আরন্ট উই সেকুলার?’ অর্থাৎ, ‘আমরা না ধর্মনিরপেক্ষ দেশ?” 
এরপরে ঠিক করা হয়েছিল যে, একসঙ্গে দু’জন শিখ নিরাপত্তা-কর্মীকে প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি ডিউটি দেওয়া হবে না। ৩১ অক্টোবর সতবন্ত সিং বলেছিল, তার পেট খারাপ। তাই তাকে শৌচালয়ের কাছাকাছি যেন ডিউটি দেওয়া হয়। এইভাবেই বিয়ন্ত আর সতবন্ত সিংকে একই জায়গায় ডিউটি দেওয়া হয়েছিল। যার পরিণতিতে স্বর্ণ মন্দিরে সেনা অপারেশন - ‘অপারেশন ব্লুস্টার’এর বদলা নিয়েছিল তারা প্রধানমন্ত্রীকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়ে। সূত্র : বিবিসি।

ব্রিটেনের এক-তৃতীয়াংশ স্কুলছাত্রী যৌন নিপীড়নের শিকার

ব্রিটেনের এক-তৃতীয়াংশ স্কুলছাত্রী যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। তাদের প্রতি তিনজনের একজন স্কুল ড্রেস পরিহিত অবস্থাতেই প্রকাশ্যে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। আর পুরুষদের অনাকাঙ্খিত যৌন দৃষ্টির সংস্পর্শে আসতে বাধ্য হয় ওই মেয়েদের দুই- তৃতীয়াংশ। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা চ্যারিটি সংস্থা প্ল্যান ইনটারন্যাশনাল ইউকের নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।


স্কুলগামী এক হাজার মেয়ের ওপর জরিপ চালানোর পাশাপাশি শিক্ষাবিদদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই অনুমান হাজির করেছে সংস্থাটি। প্রতিষ্ঠানটি বলছে রাস্তাঘাটে হয়রানিতে নিজেদের বেড়ে ওঠার একটি অপরিহার্য অংশ বলে মনে করছে অনেক মেয়ে।


প্রতিবেদনে হয়রানির ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের তা প্রতিহত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এক হাজারের বেশি কিশোরী ও ১৪ থেকে ২১ বছর বয়সী নারীদের ওপর জরিপ চালিয়েছে। এ ছাড়া এ বিষয়ে মেয়েদের পাশাপাশি শিক্ষাবিদদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে।


গবেষণা ফলাফলে দেখা যায়, জরিপে অংশ নেয়া মেয়েদের ৬৬ শতাংশই প্রকাশ্যে অনাকাক্সিত যৌন নিপীড়ন অথবা পুরুষের যৌন হয়রানিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হয়েছে। ৩৫ শতাংশ মেয়ে স্পর্শ করা, ধরা বা এলোমেলো স্পর্শের মতো অনাকাক্সিত স্পর্শের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে। স্পর্শ, তাকানো, কটূক্তি বা জোরে শিস দেয়ার মতো যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে এক-তৃতীয়াংশের বেশি মেয়ে। এদের এক-চতুর্থাংশ জানিয়েছে অনুমতি না নিয়ে অপিরিচত লোকজন তাদের ছবি তুলেছে নয়তো ভিডিও করেছে। জরিপে অংশ নেয়া আট বছর বয়সী অনেক মেয়ে জানিয়েছে, তারাও যৌন হয়রানি থেকে রেহাই পায়নি।


প্রতিবেদনে বার্মিংহামের ১৯ বছর বয়সী তরুণী মালিকাহসহ আরো বেশ কয়েকজনের সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হয়েছে। মালিকাহ জানান, একদিন একা একা হাঁটার সময় একটি কারের মধ্যে বসে কেউ একজন তার পিছু নিয়েছিল। তিনি বলেন, আমার ফোন তখন বন্ধ ছিল কিন্তু আমি এমন ভাব করে ফোনে কথা বলি যাতে মনে হয় কিছুক্ষণের মধ্যে আমার বাবা এসে আমাকে নিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, এখন আমার বাড়ি ফেরা ও সন্ধ্যার পর বাইরে যাওয়ার বিষয়ে বাবা-মা বেশি সচেতন থাকেন।


১৮ বছর বয়সী আরেক মেয়ে মনে করছেন প্রকাশ্যে হয়রানির বিষয়টি তরুণদের পুরুষালি সংস্কৃতির অংশ। ওই মেয়ের বাবাও তাকে বলেছেন, তুমি জানো যে, অনেক পুরুষ এমনই। ১৭ বছর বয়সী আরেক তরুণী বলেছে এটি এখন তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেছে।


গবেষণাকারী চ্যারিটি সংস্থা এই ধরনের প্রকাশ্যে হয়রানিকে সেক্সুয়াল হেরেজম্যান্ট (যৌন হয়রানি) হিসেবে ঘোষণা দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। যৌন হয়রানি ঠিক নয় এমন বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য জনসেচতনতামূলক প্রচারাভিযান চালানোর পরামর্শ দিয়েছে তারা। সেই সাথে প্রত্যক্ষদর্শীরা কিভাবে নিরাপদে এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে পারেন তার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা , কিশোর ও পুরুষদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও হয়রানি প্রতিহত করতে সহায়তা করা তরুণ জনগোষ্ঠীকে সম্পর্ক ও যৌন বিষয়ে সচেতনতামূলক শিক্ষা দেয়ার সুপারিশ করেছে ওই গবেষণা সংস্থা।


এর পাশাপাশি প্রকাশ্যে পাবলিক প্লেসে কাজ করা বাসচালক ও দোকান কর্মচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষকে হয়রানি প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।


গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ইউকের প্রধান নির্বাহী টানআ ব্যারন বলেন, দুঃখজনক ও গভীর উদ্বেগের বিষয় যে স্কুলপড়–য়া মেয়েরাও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। তিনি বলেন , ১২ বছর বয়সী একটি মেয়েকে প্রকাশ্যে শিস দেয়া হবে , ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্পর্শ করা হবে, বাজে দৃষ্টিতে তাকানো হবে বা পিছু নেয়া হবে এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরো বলেন, এই লজ্জাজনক আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে এবং তা বন্ধ করতে হবে।


Thursday, November 1, 2018

এলসি খোলায় রেকর্ড

দেশে পণ্য আমদানিতে লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) বা ঋণপত্র খোলায় রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে প্রায় দেড় শ’ শতাংশ পর্যন্ত এলসি খোলা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ড হয়েছে। গত অর্থবছর এলসি খোলায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। এর আগের বছর প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১১ শতাংশের কাছাকাছি। সে হিসাবে এলসি খোলায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪ গুণ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমদানি বৃদ্ধির অস্বাভাবিক প্রবণতা আগে কখনও দেখা যায়নি। দু’বছর ধরে আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

আমদানির  বিপরীতে যে পরিমাণ পণ্য আসার কথা, তা আসছে না। কিছু ক্ষেত্রে নামকাওয়াস্তে পণ্য আসছে। যে পণ্য বা মেশিনারিজ আসছে, তার মূল্য তত নয়। এভাবেই টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশ থেকে। কারণ ছাড়া অস্বাভাবিক আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলেই অর্থ পাচার হচ্ছে বলে মনে করেন তারা। নির্বাচনী বছর হওয়ায় বর্তমানে অর্থ পাচার হচ্ছে আরো বেপরোয়াভাবে। এ ছাড়া যাদের কাছে উদ্বৃত্ত টাকা আছে, তারা ওই অর্থ দেশে রাখা নিরাপদ মনে করেন না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠতে পারে। তাই তারা দেশে টাকা রাখতে চান না বলে মন্তব্য করেন। 

এদিকে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বৈঠকে বলেন, আমি মনে করি না গত দু-এক বছরের মধ্যে দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়েছে।
সমপ্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) একটি ‘ত্বরিত মূল্যায়ন জরিপে’ অংশ নেয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে ৬১ শতাংশ মনে করেন- দেশ থেকে অর্থ পাচার বাড়ছে। 

আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ৬ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি বছর অর্থ পাচারের হার বাড়ছে, যা ব্যবসায়ীদের জরিপ ফলাফলেও উঠে এসেছে। পাচারের তথ্য এসেছে সুইস ব্যাংকের রিপোর্ট, পানামা ও প্যারাডাইজ পেপারসে। 
জানা গেছে, সমপ্রতি একটি ঘটনা চট্টগ্রাম কাস্টমসে ধরা পড়ে। তাতে দেখা গেছে, ঋণপত্র খোলা হয় কাগজ আমদানির। কিন্তু চীনের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কনটেইনারে পাঠিয়েছে ৪১০ বস্তা বালুমাটি। রহস্যজনক এ ঘটনায় অর্থ পাচার হয়েছে কি-না তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 

ব্যাংকাররা বলেছেন, দেশে বেসরকারি বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে। অথচ রহস্যজনকভাবে বেপরোয়া গতিতে বাড়ছে আমদানি। মূলত এই আমদানির নাম করে দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে খাদ্যপণ্যের মধ্যে চাল ও গমেরআমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে ৩৬০ কোটি ৯১ লাখ ডলারের; যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৪৭ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। সে হিসাবে খাদ্যপণ্য আমদানিতে ঋণপত্র খোলার হার বেড়েছে ১৪৪.১০ শতাংশ, যা সম্প্রতি সময়ে রেকর্ড হয়েছে। এ সময়ে খাদ্যপণ্য আমদানিতে ঋণপত্র নিষ্পত্তি বেড়েছে ১৬১.৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ এ পণ্যগুলোর এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৩০০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১১৪ কোটি ৭৭ লাখ ডলার।

এ ছাড়া এলসি খোলা ও নিষ্পত্তিও বেড়েছে। গত অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে এলসি খোলার ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। এলসি খোলা বাড়ায় এ খাতে আমদানি খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। গেল অর্থবছরে এ খাতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। এ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও জ্বালানি তেলের এলসি খোলার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। 

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৮৮৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। সেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩৪৯ কোটি ডলার। ফলে গেল অর্থবছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২৫.২৩ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৯ শতাংশ। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল ৫.৯৪ শতাংশ। অন্যদিকে গেল অর্থবছরের পুরো সময় রপ্তানি বাবদ বাংলাদেশ আয় করেছে ৩ হাজার ৬৬৬ কোটি ৮১ লাখ ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। সে হিসাবে গেল অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়েছে মাত্র ৫.৮১ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে এলসি খোলা হয়েছে ৬ হাজার ৯৪২ কোটি ২১ লাখ ডলার; যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ হাজার ৮১২ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। ফলে এলসি খোলায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৪.২৫ শতাংশ। অন্যদিকে এ সময়ে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ৫ হাজার ১৫৩ কোটি ডলার; যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ হাজার ৪২৭ কোটি ২৭ লাখ ডলার। ফলে এলসি খোলায় নিষ্পত্তি বেড়েছে ১৬.৩৯ শতাংশ।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গেল অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র খোলা হয় ৬৪৭ কোটি ৩৪ লাখ ডলার; যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫৩০ কোটি ৮১ লাখ ডলার। সে হিসাবে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র খোলার হার বেড়েছে ২১.৯৫ শতাংশ। এ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে ৬.২৪ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ পণ্যটির এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ সময়ে পেট্রোলিয়াম তথা জ্বালানি তেল আমদানির ঋণপত্র খোলার হার ৫২.৮৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩৯৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার; যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৫৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এ সময়ে পণ্যটির এলসি নিষ্পত্তি ৩২.৭০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩৩৪ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৫২ কোটি ২২ লাখ ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শিল্পের কাঁচামালের আমদানি ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তি বেড়েছে যথাক্রমে ১১.৮৪ শতাংশ এবং ১২.৩৬ শতাংশ। এ সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে ১ হাজার ৯৮২ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৭৭২ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। আর এ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১ হাজার ৮২২ কোটি ৪০ লাখ ডলার; যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৬২২ কোটি ডলার। এ ছাড়া এ সময়ে অন্যান্য পণ্য আমদানির এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি বেড়েছে যথাক্রমে ৬৯.১০ শতাংশ ও ১১.৬২ শতাংশ। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সামপ্রতিক সময়ে দেশের আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এখানে টাকা পাচারের যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, নির্বাচনী বছরে অনেকে দেশে টাকা রাখা নিরাপদ মনে করেন না। এ কারণে আমদানিসহ অন্যান্য মাধ্যমে পুঁজি পাচার করা হয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পাচার রোধে তৎপরতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো। কিন্তু সমপ্রতি আমদানি যে পরিমাণে বেড়েছে, অর্থনীতিতে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। কর্মসংস্থান ও পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। রপ্তানিতেও তার প্রভাব সেভাবে পড়েনি। এজন্যই আমদানির চিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।