ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১২টা ১ মিনিট। বিটের তালে তালে কেঁপে উঠছে চার দেয়াল। বিশাল পার্টি রুমের চারদিকে লেজার লাইটের ঝলকানি। বাজছে ইংরেজি, হিন্দি গান। মঞ্চের সামনে তরুণদের সঙ্গে বেসামাল হয়ে নাচছেন স্বল্প বসনা তরুণীরা। আর মঞ্চ থেকে তাদের উৎসাহ দিচ্ছেন ডিজে তরুণীরা। এক হাতে হুইস্কির গ্লাস আর অন্য হাতে সিগারেট। ডিজে তরুণীদের জড়িয়ে কম যাননি সেখানে উপস্থিত তরুণরা।
কেউ কেউ মিউজিকের তালে তালে নেচে আবার কেউবা ভালোবাসার মানুষটিকে জড়িয়ে বরণ করে নেন নতুন বছরকে।
সোমবার রাতে ইংরেজি নববর্ষ-২০১৯ কে বরণ করে নিতে এমনটাই ছিল রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলের চিত্র। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে আগে থেকেই সতর্ক ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাই এবারের ইংরেজি নববর্ষ অনেকটা সীমিত পরিসরে বরণ করে নিতে হয়েছে। চার দেয়ালের বাইরে থার্টিফার্স্টের কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না বলে আগেই জানিয়েছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। তাই ঢাকা শহরের কোথাও উন্মুক্ত স্থানে, ছাদে, রাস্তার মোড়ে কোথাও থার্টিফার্স্টের আয়োজন করতে দেখা যায়নি। তবে ঢাকা শহরের সবক’টি অভিজাত হোটেল, ক্লাবে থার্টিফার্স্টের আয়োজন করা হয়েছিল। এ ছাড়া অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ছাড়াও আরো বেশ কিছু বাসায় নতুন বছরকে বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে বরণ করা হয়েছে।
খিলক্ষেত এলাকার তারকা হোটেল ঢাকা রিজেন্সি। সন্ধ্যার পর থেকে এই হোটেলে আনাগোনা বেড়ে যায় অভিজাত ঘরের তরুণ-তরুণীদের। নতুন বছরকে বরণ করে নিতে হোটেলটির ১৪ তলায় আয়োজন করা হয় ডিজে পার্টির। সেখানে দেখা যায় উচ্চ শব্দে স্পিকারে বাজছিল গান। গানের তালে তালে চলতে থাকে ফ্যাশন শো, লাতিন, বেলে ড্যান্স। তরুণদের কারো হাতে হুইস্কি আবার কারো হাতে বিয়ারের ক্যান। স্বল্প বসনা তরুণীরা তখন চেপে আছেন তাদের বুকে। মদ খেতে খেতেই তারা নাচছিলেন। মাতাল হয়ে অনেক তরুণ-তরুণী দিশহাারা হয়ে পড়েন।
ঘনিষ্ঠজনরা তাদের অন্যত্র নিয়ে যান। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় রিজেন্সির দৃশ্য। বিভিন্ন বয়সের, নানান শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। রাত ১টার দিকে ড্যান্স ফ্লোরে পুরুষদের নেচে নেচে আনন্দ দিচ্ছিলেন ডিজে তরুণীরা। থার্টিফার্স্টের এই রাতটি ছিল তাদের কাছে আনন্দঘন ও উন্মাদনায় হারিয়ে যাওয়ার এক রাত। রিজেন্সিতে কথা হয় ডিজে তরুণী জিসির সঙ্গে। জিসি রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকে নাচের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। স্বপ্ন ছিল দেশের মধ্যে বড় একজন নৃত্য শিল্পি হবেন। কিন্তু নানা কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খান তার মা জিনিয়া সুলতানা।
তাই বাধ্য হয়ে পরিবারের হাত ধরেই তিনি বিভিন্ন হোটেলের পার্টিতে নাচেন। প্রথম দিকে খাপ খাইয়ে নেয়াটা ছিল কষ্টকর। কিছুদিন যাবার পর এধরনের পরিবেশের সঙ্গে তিনি মানিয়ে নেন। এখন ঢাকা শহরের অনেক পার্টিতেই তার অনেক চাহিদা আছে বলে জানান জিসি। জিসি বলেন, এই কাজে নানা প্রতিবন্ধকতা আছে। অনেক পুরুষই খারাপ প্রস্তাব দেয়। তারা আমাকে যা ভাবে আমিতো সেরকম না। ডিজে তরুণী সাইমা বলেন, আমার কয়েকজন বান্ধবী আগে থেকেই পার্টিতে নাচত। আমি নাচ না পারাতে আর যাওয়া হতো না। কিন্তু আমার বান্ধবীরা আমাকে গাইড লাইন দিয়ে শিখিয়ে নেয়। তারপর থেকে এ পথে চলে আসা। তিনি বলেন, পরিবারের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে আমি এই কাজ করি। থার্টিফার্স্ট ছাড়া যে কোনো ধরনের পার্টিতে অংশগ্রহণ করি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, থার্টিফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন কয়েক শতাধিক ডিজে তরুণ-তরুণী। থার্টিফার্স্টের পার্টিতে আসা অতিথিদের মনোরঞ্জন করার জন্য তারা গত এক মাস ধরে তৈরি করে নিয়েছেন নিজেকে। এদিকে রাজধানীর অনেক হোটেলে ও বাসায় অনেকটা ঘরোয়া পরিবেশে থার্টিফার্স্টের আয়োজন করা হয়েছিল। এমন ঢাকার আশেপাশের এলাকার অনেক হোটেল-রিসোর্টে দেখার মতো আয়োজন ছিল। চার দেয়ালের ভেতরে হলেও সেখানে আমোদ-ফুর্তির কমতি ছিল না। গাজীপুরের একটি রিসোর্টে গিয়ে দেখা যায় সেখানে বেশ জাঁকজমক ভাবেই পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন শেণি-পেশার অন্তত শতাধিক নারী-পুরুষ সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। গভীর রাতে সেখানে গিয়ে দেখা যায় বিটের তালে তালে শরীর দুলিয়ে নাচছিলেন কয়েকজন তরুণী। উল্মাতাল নাচে গানে তারা বরণ করেন নতুন বছরকে।
No comments:
Post a Comment