Thursday, July 26, 2018

বিদেশি অর্ডার বাতিলের শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে হয়। এসব পণ্যের শুল্ক আদায় করে কাস্টম হাউস। আমদানি পণ্যের মান যাচাইয়ে এখানে একটি অত্যাধুনিক ল্যাব থাকার কথা। কিন্তু জরাজীর্ণ ল্যাব এবং পুরনো যন্ত্রপাতির কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন পোশাক রপ্তানিকারকরা। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি অর্ডার বাতিলের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।


ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ল্যাবে অধিকাংশ সময় ভুল রিপোর্ট আসছে। কখনো কখনো ল্যাবে থাকা যন্ত্রে পণ্যের নমুনা পরীক্ষা সম্ভব হচ্ছে না। এতে একদিকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে সঠিক সময়ে কাঁচামাল পান না ব্যবসায়ীরা। ভুল রিপোর্ট এলে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে গিয়ে নিজ দায়িত্বে টেস্ট করাতে হচ্ছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো ভোগান্তির পর কাস্টমসের রিপোর্ট ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। এর পরও ল্যাব টেস্টের হয়রানি বন্ধ হচ্ছে না। বর্তমানে এ ধরনের ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে।


ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী এসজিএসের টেস্ট রিপোর্ট অনুযায়ী কাস্টমস কর্মকর্তারা পণ্যের শুল্কায়ন করবেন। কিন্তু তারা পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে কাস্টমসের ল্যাবে পরীক্ষা করছেন। সেখানে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে কিছুটা গরমিল পাওয়া যায়। এর পরই ব্যবসায়ীদের ছুটতে হয় টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় ও বিসিএসআইআরের ল্যাবে। একাধিক রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, কাস্টমসের রিপোর্টই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।


সান অ্যাপারেলসের আমদানি করা কাপড় গত বছরের ২ নভেম্বর এসজিএস নমুনা সংগ্রহ করে ৬ নভেম্বর রিপোর্ট দেয় শতভাগ ভিসকস। ১২ নভেম্বর কাস্টমসের টেস্ট রিপোর্টে আসে শতভাগ কটন। ২০ নভেম্বর বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব টেস্ট এবং ৩ ডিসেম্বর বিসিএসআইআরের ল্যাবের টেস্টে শতভাগ ভিসকস আসে। এর পর চালানটি খালাস পায়। অর্থাৎ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানটি তার চাহিদার প্রায় ২৭ দিন পর কাঁচামাল পেয়েছে। ফলে একদিকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতাকে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য রপ্তানি করতে পারেনি।


একই বছরের ২৯ নভেম্বর চীন থেকে আমেনা প্রাইভেট লিমিটেডের আনা শতভাগ ভিসকস কাপড়ের নমুনা সংগ্রহ করে কাস্টমস ল্যাবে পাঠান রাজস্ব কর্মকর্তা আবুল কাসেম। ল্যাবের ঊর্ধ্বতন রাসায়নিক সহকারী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তাকে জানান, নমুনাটি সঠিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ৯৯ শতাংশ কটন ও ১ শতাংশ ইলাস্টিক ওভেন ঘোষণায় চীন থেকে আনা পণ্যের চালান খালাস নিতে ২৮ নভেম্বর নথিপত্র দাখিল করে আজিম গ্রুপ অব কোম্পানি। চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের টেস্ট রিপোর্ট দাখিল করলেও কাস্টমস ল্যাবের পরীক্ষায় আসে মিক্সড ফেব্রিক। পরে চেম্বার নেতারা কাস্টমস কমিশনারকে বিষয়টি জানালে তিনি সুরাহার আশ্বাস দেন। কিন্তু এখনো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।


বিজিএমইএ পরিচালক মাহবুব চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাসায়নিক পরীক্ষাগারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় সঠিক পরীক্ষা সম্ভব হয় না। ভুল রিপোর্ট আসে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের পরীক্ষাগারের সঙ্গে বুয়েট বা টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবের রিপোর্টের মিল পাওয়া যায় না। এতে ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়ছেন। যত দ্রুত সম্ভব আধুনিকায়ন প্রয়োজন।


কাস্টমসের এক কর্মকর্তা জানান, ল্যাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ও লোকবল নেই। তার পরও নিয়মিত সেবা দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত লোকবল থাকলে সেবার মান আরও বাড়ত। চট্টগ্রাম কাস্টমস ল্যাবরেটরির মাধ্যমে মাসে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা রাজস্ব আসে। প্রয়োজনীয়সংখ্যক আধুনিক যন্ত্রপাতি ও জনবল থাকলে রাজস্ব আহরণের পরিমাণও বাড়বে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।


নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজনের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার ড. একেএম নুরুজ্জমান বলেন, ল্যাবের সব যন্ত্র যে খারাপ তা নয়। সেখানে অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি আছে। এর পরও আমরা খুব দ্রুত ল্যাব আধুনিকায়নের ব্যবস্থা নেব।


No comments:

Post a Comment